সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
বাংলার মানুষের ভোটের নির্বাচিত রাজ্য সরকারের সঙ্গে কোন রকম আলোচনা না করেই দার্জিলিং সহ পাহাড়ের সমস্যার সমাধানের জন্য মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের যে সিদ্ধান্ত কেন্দ্র সরকার নিয়েছে তা কোন আইনে?’ এমন প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি রাজ্যের অধিকারী কেন্দ্রীয় সরকারের অনধিকার হস্তক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদিকে চিঠি দিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, রাজ্যকে অন্ধকারে রেখে কেন্দ্রের এই পদক্ষেপের কথা জানতে পেরে তিনি বিস্মিত এবং ব্যথিত।
আলাদা রাজ্য হিসেবে গোর্খাল্যান্ডের দাবি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে একজন মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করা হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে। দেশের প্রাক্তন উপ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা তথা অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস অফিসার পঙ্কজ কুমার সিংকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। শুক্রবার কেন্দ্রের তরফে এই নিয়োগপত্র পাঠানোর পরেই শনিবার মোদিকে চিঠি লিখেছেন মমতা। শনিবার সাউথ ব্লকে ওই চিঠি পাঠিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। চিঠিতে তাঁর অভিযোগ করেছেন, গোর্খা সম্প্রদায় এবং গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিটিএ)-র বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস অফিসার পঙ্কজ কুমার সিংকে কেন্দ্র সরকারের তরফে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে— অথচ এই সিদ্ধান্তে রাজ্য সরকারের সঙ্গে কোনওরকম পরামর্শই করা হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পাঠানো চিঠিতে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সরাসরি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীনে। এই অঞ্চলের প্রশাসনিক স্থিতাবস্থা ও শান্তি রক্ষা রাজ্যের দায়িত্ব। কেন্দ্রের এই একতরফা পদক্ষেপ সহায়ক নয়, বরং সংবিধানের সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিপন্থী।’ বাংলার রাজ্য সরকারের সঙ্গে পাহাড়ে পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্য তৈরীর বিষয় যে ত্রিপাক্ষিক আলোচনা সরকারের আমলে হয়েছিল সেই তথ্যও আজ মনে করিয়ে দিয়েছেন মোদিকে। চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী মনে করিয়ে দিয়েছেন, ২০১১ সালের ১৮ জুলাই দার্জিলিংয়ে তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে কেন্দ্র, রাজ্য ও গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা— এই তিন পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তির ভিত্তিতেই গঠিত হয়েছিল জিটিএ। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়ি অঞ্চলের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত উন্নয়ন এবং জাতিগত পরিচয় রক্ষা করা। মমতা আরও উল্লেখ করেছেন, ২০১১ সালে রাজ্যে সরকারে আসার পর থেকেই পাহাড়ে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে তাঁর সরকার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং সেই শান্তিই আজ পাহাড়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
চিঠিতে স্পষ্ট ভাষায় মমতা লিখেছেন, ‘গোর্খা সম্প্রদায় বা জিটিএ-র সঙ্গে যুক্ত কোনও উদ্যোগ রাজ্য সরকারের সঙ্গে পূর্ণ পরামর্শ করেই করা উচিত। একতরফা কোরনও পদক্ষেপ এই সংবেদনশীল অঞ্চলের শান্তি ও সম্প্রীতির পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারে।’ তিনি প্রধানমন্ত্রীকে খনূচ করেছেন, অবিলম্বে করে তা প্রত্যাহার করার জন্য। মমতার বক্তব্য, ‘ফেডারেল কাঠামো ও কেন্দ্র-রাজ্য পারস্পরিক সম্মানের প্রকৃত চেতনার সঙ্গেই এটাই সঙ্গত।’

এই ধরনের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো আঘাত। মমতা লেখেন, ‘এই সংবেদনশীল বিষয়ে একতরফা কোনও পদক্ষেপ অঞ্চলের শান্তি ও সম্প্রীতির পক্ষে একেবারেই অনুকূল হবে না। সুতরাং, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পূর্বপরামর্শ ও যথাযথ আলোচনার বাইরে গিয়ে যে নিয়োগপত্রটি জারি করা হয়েছে, আমি অনুরোধ করছি তা পুনর্বিবেচনা করে প্রত্যাহার করা হোক। কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে প্রকৃত সহমর্মিতা ও যুক্তরাষ্ট্রীয় স্বার্থে এই পদক্ষেপই প্রত্যাশিত।’