সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
‘বুথস্তরে সংগঠন নেই। বিজেপি ভাবছে এসআইআর এর মাধ্যমে কমিশনের ঘাড়ে ভর দিয়ে বাংলা দখল করবে। যাঁরা নিজেদের নেতা, কর্মীদের ধরে রাখতে পারে না, তারা নাকি বাংলা দখল করবে! আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি, এসআইআর এর পরও ২৬ সালের ভোটে তৃণমূলের আসন এবং ভোট সংখ্যা দুটোই বাড়বে।’ এভাবেই আজ সোমবার ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বিষ্ণুপুরে সেবাশ্রয় শিবির উদ্বোধনের পরে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে একযোগে তীব্র আক্রমণ করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
‘এসআইআর আতঙ্কে’ বিএলও-সহ সাধারণ নাগরিকদের মৃত্যু এবং পরিকল্পনাহীনতার মতো পাঁচটি বিষয়ে কমিশনের উদ্দেশে তৃণমূলের ১০ সাংসদের প্রতিনিধিদল প্রশ্ন তুলেছিল। কমিশনের কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পরে তৃণমূল দাবি করেছিল, একটি প্রশ্নেরও সদুত্তর মেলেনি কমিশনের তরফে। সোমবার অভিষেক বলেন, ‘পাঁচটা প্রশ্ন ছেড়ে দিন। কমিশন যদি প্রকাশ করতে পারে, একটি প্রশ্নেরও উত্তর তারা দিয়েছে, তা হলে টানতে টানতে কোর্টে নিয়ে যাব। আমাদের হাতে ডিজিটাল এভিডেন্স (ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ) রয়েছে। আমি হাওয়ায় কথা বলি না।’ কমিশন সূত্রে শুক্রবার বলা হয়েছিল, বিএলও এবং ইআরও-দের অতিরিক্ত ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত নবান্নকেও জানানো হয়েছিল। কিন্তু নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ওই ভাতার অর্থ বরাদ্দ করা হয়নি নবান্নের তরফে। সোমবার নিজের লোকসভা কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারে স্বাস্থ্যশিবির ‘সেবাশ্রয় ২’ উদ্বোধনের পর মহেশতলায় সাংবাদিক সম্মেলন করে অভিষেক পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছোড়েন কমিশনের উদ্দেশে। তিনি প্রথমে বলেন, ‘বাংলার যে বকেয়া রয়েছে, সে ব্যাপারে কমিশন চিঠি লিখুক কেন্দ্রীয় সরকারকে। বকেয়া অর্থের ৫০ শতাংশ কেন্দ্র দিলে বিএলও-দের অ্যাকাউন্টে ৬০ হাজার টাকা করে দেবে রাজ্য সরকার।’ এর পরে তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, ‘কেন্দ্রকে টাকা দিতে হবে না। বাংলার প্রাপ্য দেওয়ার কথা বলে কমিশন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীকে চিঠি লিখলেও বিএলও-দের অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পৌঁছে যাবে।’
সোমবার সংসদের শীতকালীন অধিবেশনের শুরুতেই বিরোধীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংসদ নাটক (ড্রামা) করার জায়গা নয়। মহেশতলা থেকে প্রধানমন্ত্রীর ‘নাটক’ মন্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছেন লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা অভিষেক। তিনি বলেন, ‘বিএলও-রা মারা যাচ্ছেন। সাধারণ মানুষ আত্মঘাতী হচ্ছেন। এত মানুষের মৃত্যুকে ড্রামা বলছেন প্রধানমন্ত্রী! কে নাটক করছে গোটা দেশ দেখছে!’
সোমবার থেকে শুরু হওয়া স্বাস্থ্যশিবির ‘সেবাশ্রয় ২’ চলবে আগামী জানুয়ারি মাস পর্যন্ত। প্রথমে প্রতিটি বিধানসভায় হবে সাত দিন করে হবে শিবির। সোমবার যা শুরু হয়েছে মহেশতলা থেকে। তার পরে ধাপে ধাপে মেটিয়াবুরুজ, বজবজ, বিষ্ণুপুর, ফলতা, সাতগাছিয়া হয়ে প্রকল্পটি শেষ হবে ডায়মন্ড হারবারে। ২২ জানুয়ারি ডায়মন্ড হারবারের শিবির শেষ। ২৩ জানুয়ারি সরস্বতী পুজো এবং নেতাজি জয়ন্তীর জন্য ফাঁকা রাখা হবে। তার পরে ২৪-২৮ জানুয়ারি হবে সব বিধানসভায় ‘ফলোআপ ক্যাম্প’। দ্বিতীয় পর্ব শুরু করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘চলতি বছরের শুরুতে আমরা সেবাশ্রয় প্রথম শুরু করেছিলাম। এটা সেবাশ্রয়ের দ্বিতীয়পর্ব, আর আমি তা মহেশতলার মাটি থেকে উদ্বোধন করলাম। এর আগে আমি বাটানগরের ক্যাম্পেও গেছি। আমি আমার সংবাদমাধ্যমের বন্ধুদের অনুরোধ করব একবার রথতলা ময়দানের এই ক্যাম্প ঘুরে দেখুন। কত ভালো পরিকাঠামো আমরা তৈরি করেছি, দেখে আসুন। অর্থপেডিক্স, নিউরোলজি থেকে শিশুরোগ, প্রত্যেকটা আলাদা বিভাগের জন্য এখানে পৃথক চেম্বারে আপনারা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দেখতে পাবেন। আমরা সমস্তরকম রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছি। রয়েছে সেরোলজি টেস্ট, আছে ইউএসজি, ইসিজি, স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ের পরীক্ষাও। রোগীদের যে সমস্যাই থাকুক না কেন, আমরা চেষ্টা করেছি আমাদের সাধ্য মতো সমস্ত ধরণের পরীক্ষার পরিকাঠামো তৈরি রাখতে। যারা এখানে রক্তপরীক্ষা করতে আসছে, তাঁরা ২ দিনের মধ্যেই সরাসরি নিজেদের ফোনে বা হোয়াটসঅ্যাপে রিপোর্ট পেয়ে যাবে। আমরা ওষুধের ব্যবস্থাও করেছি সেভাবে। যাতে চিকিৎসকরা যতদিনের ওষুধ রোগীকে দেবেন, সেটা ৭ দিন, ১০ দিন বা ১৫ দিন হোক, আমরা গতবারের মতো এবারেও একেবারে তা বিনামূল্যেই পৌঁছে দেব।’

ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ হিসেবে ডায়মন্ড হারবারের মানুষের জন্য প্রথমে সেবাশয় শিবির শুরু করলেও বাংলা সহ পার্শ্ববর্তী রাজ্যের মানুষও যে এর ফলে উপকৃত হয়েছেন সেই দাবী করে অভিষেক বলেন, ‘আপনারা জানলে খুশি হবেন, যে গতবার আমরা আমাদের ক্যাম্প থেকে প্রায় ১২ লক্ষ রোগীকে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা প্রদান করেছি। যেখানে শুধু ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের মানুষজনই নয়, অন্য জেলার বাসিন্দারা, রাজ্যের দূর দূরান্ত থেকেও এই স্বাস্থ্য শিবিরে এসেছে। ঈশ্বরের কৃপায় কোনও রোগীকে খালি হাতে ফিরতে হয়নি। ২,৫০০-এর বেশি ছানি অপারেশনের পাশাপাশি প্রায় ৭,০০০ রোগীকে হাসপাতালে রেফার করা হয়েছিল। এসএসকেএম, বাঙ্গুর, ডায়মন্ড হারবার মেডিক্যাল কলেজে সেই রোগীরা যথাযথ চিকিৎসা পেয়েছেন, তাঁদের পরিবারের সঙ্গেও আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছি। এই মডেল ক্যাম্পগুলোয় অত্যন্ত গুরুতর রোগেরও চিকিৎসা করার পরিকাঠামো রয়েছে। তবুও যখনই রোগীদের বিশেষ পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়েছে, তাঁদের সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। সেখানেই আমাদের কাজ থেমে থাকেনি। আমাদের চিকিৎসক এবং প্রতিনিধিরা নিয়মিত রোগীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। চিকিৎসার প্রয়োজনে আমরা অনেক রোগীকে গতবার দক্ষিণ ভারত-সহ অন্য রাজ্যেও পাঠিয়েছি, বিশেষত স্নায়ুরোগের ক্ষেত্রে বিশেষ চিকিৎসার জন্য। ডায়মন্ড হারবারের মানুষের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ আমায় এই মাটির বাঁধনে আবদ্ধ করায়। আমি প্রায়ই বলি, আমার জন্মভূমি কলকাতার কালীঘাট, কিন্তু কর্মভূমি হল ডায়মন্ড হারবার। তাই একবার শিবির ঘুরে দেখার অনুরোধ রাখছি। রেডিয়েশন সমস্যার কথা মাথায় রেখে আলাদা এক্স-রে ইউনিট রাখা হয়েছে। পৃথক ওয়েটিং এরিয়া, রেজিস্ট্রেশন সিস্টেমের পাশাপাশি ওষুধ বিতরণের জন্যেও আলাদা জায়গা রাখা হয়েছে। গতবার ৭০–৭৫ দিন কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আরও উন্নত ব্যবস্থা করা হয়েছে।’