শোভন গায়েন। কলকাতা সারাদিন।
“একটাই দাবি। দফা এক, দাবি এক, মমতার পদত্যাগ। শুধু পদত্যাগ নয়, আমরা আশাবাদী, আজ যে ভাষায় প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ইটস আ ক্রাইম, অর্গানাইজড বাই দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। দ্যাট মিনস গভর্নমেন্ট। তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যাবিনেটও যাতে জেলে যায়…। আমরা আশাবাদী, এই ২৬ হাজার যুবক-যুবতী বিনা দোষে …কারো যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যেভাবে আজ তাঁরা পথে বসলেন, তাঁদের পথে যিনি বসালেন, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর ক্যাবিনেটের জেল চাই। গ্রেফতারি চাই। এটাই বাংলার আওয়াজ।” সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বাংলার প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক শিক্ষিকার চাকরি বাতিলের রায় জানার পরেই এভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেফতারের দাবী তুললেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।
চাকরিহারারা বারবার বলছেন, সংবিধানে বলা আছে একজন নির্দোষেরও যেন শাস্তি না হয়। কিন্তু তাঁদের তো পুরো প্যানেলই বাতিল হয়ে গেল। তাহলে কী হবে? তবে সুপ্রিম কোর্ট বলছে, যোগ্য-অযোগ্য পৃথকীকরণ সম্ভব নয়। তাই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে চাকরি বাতিলের। এ দিন সুপ্রিম কোর্টের রায় নিয়ে আইনজীবী ফিরদৌস শামিম বলেন, “যাঁরা সত্যি-সত্যিই যোগ্য, টাকা দেননি সেই রকম প্রার্থী আছেন। কিন্তু যোগ্য-অযোগ্যদের পৃথকীকরণ হয়নি বলেই তো আজকের এই প্যানেল বাতিল হয়েছে।”
এই প্রসঙ্গে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “মহামান্য কলকাতা উচ্চ আদালত, মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট বার বার এসএসসিকে সময় দিয়েছে যোগ্য ও অযোগ্য চাকরিরত শিক্ষকদের আলাদা করার জন্য। ৫ই মে ২০২২ তারিখে এই দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের ক্যাবিনেট অযোগ্যদের বাঁচানোর জন্য বেআইনি ভাবে সুপারনিউমারারি পোষ্ট তৈরী করেছিল। বিরোধী দল হিসেবে বিজেপি বিধায়কদের প্রতিনিধি দল কে সাথে নিয়ে এসএসসি ভবনে আমি নিজেও এই বিষয়ে সঠিকভাবে যোগ্য এবং অযোগ্যদের তালিকা আলাদা করে দেওয়ার দাবী জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম যে আপনারা যোগ্য এবং অযোগ্যদের তালিকা আলাদা আলাদা করে মহামান্য আদালত কে জমা দিন, নচেৎ অযোগ্যদের জন্য যোগ্যরা বিপদে পড়বেন ও তাদের পরিবারগুলি ভেসে যাবে, সামাজিক সম্মান নষ্ট হবে।
আজ মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট মহামান্য কলকাতা উচ্চ আদালতের রায় কে মান্যতা দিয়ে ২০১৬ সালের এসএসসির পুরো প্যানেল বাতিলের নির্দেশ বহাল রাখল। অর্থের বিনিময়ে চাকুরিরত অযোগ্যদের বাঁচাতে যোগ্যদের বলি দেওয়া হল। এর সম্পূর্ণ দায় ভার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যনার্জীর। অবিলম্বে মমতা ব্যনার্জীর পদত্যাগ ও গ্রেফতারের দাবি করছি।”
সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী গোটা বিষয়ের জন্য রাজ্য সরকারের অপদার্থতাকে দায়ী করেছেন। সুজন চক্রবর্তী বলেন, “খুবই অস্বস্তির ব্যাপার যে পশ্চিমবাংলায় ১৬ সালের এসএসসির নিয়োগ সুপ্রিমকোর্ট বাতিল করল। হাইকোর্ট এই অর্ডার দিয়েছিলই। সুপ্রিম কোর্ট মান্যতা দিল। বলল, এমন ধরনের অপরাধ হয়েছে, দুর্নীতি এত ভয়াবহ এবং গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়াকে যেভাবে কলুসিত করা হয়েছে, এটা সংশোধন করার মতো কোনও সুযোগ নেই। এক বছর সুযোগ পেয়েছিল আমাদের সরকার যে কারা যোগ্য আর কারা নয় তা স্পষ্ট করতে। একবছর ধরে সরকার স্পষ্ট করতে পারল না। কতোটা টাকা খেয়েছে। হাজার হাজার ছেলেমেয়ের জীবন ধ্বংস করছে কেন। কিছু অযোগ্যদের টাকা নিয়ে চাকরিতে ঢোকানো হয়েছে রাজ্য সরকার এবং শাসক দলের তরফে, তাদের বাঁচানোর জন্য স্রেফ এতগুলো ছেলেমেয়ের চাকরি গেল! সরকার দাঁড়াল অযোগ্যদের পাশে, যোগ্যদের বাতিল হল চাকরি।”
এই সরকারকে অবিলম্বে সরিয়ে দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। শুধু সরিয়ে দেওয়া নয়, তিনি বলেন, ‘ লাথি মেরে এই সরকারকে বাতিল করা উচিত। এই সরকার যোগ্য ছেলেমেয়েদের পেটে লাথি মারল। ভয়াবহ! ভাবাই যায় না।’
শীর্ষ আদালতের এসএসসি রায় নিয়ে জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “এই ২৬ হাজার চাকরি বাতিলের পুরো দায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসকের। সুপ্রিম কোর্ট বারবার বলার পরেও যোগ্য ও অযোগ্যদের বাছাই করে কোনও তালিকা আদালতে জমা দেওয়া হয়নি। সুপ্রিম কোর্ট হয়তো যোগ্যদের চাকরিতে রাখতে চাইছিল। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যোগ্য ও অযোগ্যদের বাছাই করে দেননি। তারই মাশুল দিতে হাজার-হাজার যোগ্য প্রার্থীদের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু চিৎকার করেন। তিনি নাকি চাকরি দিচ্ছেন। আপনিই আজ সবার চাকরি খেলেন। শিক্ষামন্ত্রী জেলে আছেন, শিক্ষা দফতরের একাধিক কর্তা জেলে আছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে প্রমাণ হল মাথা ধরতে আর বেশি দেরি নেই।”
সুকান্ত মজুমদার সংবাদমাধ্যমকে তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জানান, “আজ মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট এই যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ২৫ হাজার ৫৭৩ জনের যে চাকরি চলে গেল, যাঁরা ২০১৬ সাল থেকে চাকরি করছেন, তাঁদের পরিবার রয়েছে। আজকে যোগ্য যাঁরা, যাঁরা পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেয়েছিলেন, তাঁদেরও চাকরি চলে গেল। শুধুমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পার্টির লোকেরা অযোগ্যদের – যাঁরা পয়সা দিয়ে চাকরি পেয়েছিলেন, তাঁদের চাকরি বাঁচানোর জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৬ হাজার মানুষের চাকরির বলিদান দিয়ে দিলেন! এর জন্য দায়ী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই যে ২৬ হাজার পরিবার রাস্তায় বসে গেল, তার জন্য দায়ী তৃণমূল কংগ্রেস এবং তাদের সর্বময় কর্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর চ্যালাচামুণ্ডারা। যাঁরা লাখ লাখ টাকা নিয়ে কয়েকজন অযোগ্যকে চাকরি পাইয়ে দিয়েছিলেন। আজকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দলের দুষ্কৃতী, জোচ্চোরদের জন্য এতগুলি পরিবার রাস্তায় বসল। আমরা ছেড়ে দেব না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চেয়ার থেকে উৎখাত করব। বলে দিচ্ছি, রামনবমী পার হয়ে গেলেই ভারতীয় জনতা পার্টি পূর্ণ শক্তি দিয়ে এর বিরুদ্ধে পথে নামবে।”