রবীন্দ্রনাথের মাটি থেকে ভাষা আন্দোলনের সূচনা
বিগত কয়েক মাস ধরে দেশের বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশ উত্তরপ্রদেশ দিল্লি অসম ওড়িশা হরিয়ানার মতো রাজ্যগুলিতে বাংলা ভাষায় কথা বললেই বাঙ্গালীদের হেনস্থা করার পাশাপাশি কখনো গ্রেফতার আবার কখনো বা আটক করে বাংলাদেশে ছেড়ে দিয়ে আসার অভিযোগ উঠেছে। তার প্রতিবাদেই এবারে দেশ জুড়ে বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূচনা করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এই আন্দোলনের সূচনার জন্য বেছে নিলেন রবীন্দ্রনাথের মাটি বোলপুর তথা শান্তিনিকেতনকে।
সোমবার দুপুরে বোলপুর শহরের বুক চিরে বাংলা ভাষার সম্মান রক্ষার শপথ নিয়ে কবিগুরুর ছবি হাতে মিছিলে হাঁটলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা ভাষার অপমান যাঁরা করছেন, তাঁদের ‘রাজনৈতিক বিসর্জনের’ হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। সোমবার বোলপুরে নিজেও পদযাত্রায় অংশ নেন। পদযাত্রার পরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন, আমি বাংলায় বাঁধি সুর/আমি এই বাংলার মায়া ভরা পথে, হেঁটেছি এতটা দূর’’ বাংলা ভাষার সম্মান রক্ষার্থে, আজ বোলপুরে রবিঠাকুরের পুণ্যভূমিতে ‘ভাষা আন্দোলন’-এর পদযাত্রায় শামিল হয়েছিলাম। আজকে যাঁরা জনস্রোতে পায়ে পা মিলিয়ে হেঁটেছেন আমি তাঁদের আন্তরিক ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা জানাই।
আজকের এই মিছিলের কণ্ঠস্বর বুঝিয়ে দিয়েছে যে, আগামী দিনগুলিতে অ-গণতান্ত্রিক এবং জনবিরোধী কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই আরও জোরালো হবে। দৃঢ় বিশ্বাস ভাষা-বিরোধী, জাতি-বিরোধী, বাংলা-বিদ্বেষীর সামনে বাংলার মানুষ কখনও মাথা নত করবে না। আমাদের স্মরণে রাখতে হবে – ‘বাংলা ভাষার সম্মান, বাংলার সম্মান’। আমরা আঞ্চলিক ভাষা থেকে শুরু করে সব ভাষাকেই সম্মান ও শ্রদ্ধা করি, অথচ বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষীদের উপর নির্যাতন, নিপীড়ন চলছে। ভিন্রাজ্যে কেউ বাংলা ভাষায় কথা বললে, তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ বলা হচ্ছে এবং তাঁদের বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হচ্ছে। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমাদের এই ‘ভাষা-আন্দোলন’ জারি থাকবে যতক্ষণ না বাংলা-বিদ্বেষ সম্পূর্ণ বন্ধ হচ্ছে, বাঙালি-হেনস্থা বন্ধ হচ্ছে।
এই বাংলা সর্বধর্ম সমন্বয়ের, এই বাংলা শান্তি-ঐক্য ও সম্প্রীতির মেলবন্ধনে আবদ্ধ। এই বাংলা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভাষায় উজ্জীবিত। এই বাংলা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, স্বামী বিবেকানন্দ, রাজা রামমোহন রায়ের আদর্শে জাগ্রত। এই বাংলার প্রতি লাঞ্ছনা-বঞ্চনা, অত্যাচার, নিপীড়নের সঠিক জবাব গণতান্ত্রিক পথেই দেবে বাংলার মানুষ।
জয় হিন্দ! জয় বাংলা!”
পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা
‘নিপীড়িত’ বাঙালিদের পাশে দাঁড়াতে হেল্পলাইনও চালু করেছে রাজ্য পুলিশ। রাজ্য পুলিশের তরফে চালু করা হেল্পলাইন নম্বরটি হল – ৯১৪৭৭২৭৬৬৬। আক্রান্তরা কিংবা আক্রান্তদের পরিবারের লোকজনেরা এই নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন। এই নম্বরটিতে নাম, ঠিকানা-সহ হোয়াটসঅ্যাপ করা যাবে। ওই অভিযোগ খতিয়ে দেখবে রাজ্য পুলিশ। পরে সংশ্লিষ্ট রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বাংলার পুলিশ। প্রয়োজনে জেলার কন্ট্রোল রুম এবং স্থানীয় থানায় যোগাযোগ করতে পারেন ‘আক্রান্ত’রা।
এবার বাঙালি ‘হেনস্তা’ রুখতে বড় পদক্ষেপ করলেন তিনি। সোমবার, বোলপুরের গীতাঞ্জলি প্রেক্ষাগৃহে প্রশাসনিক সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করলেন, ”বাইরে আমাদের ২২ লক্ষ। পরিযায়ী শ্রমিক কাজ করে। তাঁদের সবাইকে ফিরিয়ে আনুন এবার।” মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ, ”দরকার নেই দালালদের সাহায্য নিয়ে বাইরে গিয়ে কাজ করার। ওদের উপর অত্যাচার হলে দালালরা থাকে না, পালিয়ে যায়। ওঁরা ফিরে এলে এখানে যদি থাকার জায়গা থাকে, তাহলে তো ভালো। আর তা না থাকলে, আমরা ক্যাম্প বানিয়ে দেব। রেশন কার্ড, স্বাস্থ্যসাথী কার্ড, কর্মশ্রী প্রকল্পে ওঁদের কাজের ব্যবস্থা করে দেব। ওঁদের জব কার্ড দিয়ে দেওয়া হবে।” এই মুহূর্তে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে রাজ্য সরকারের তৈরি সেলের দায়িত্বে রয়েছে বীরভূমের ভূমিপুত্র তথা তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম। তাঁর উদ্দেশেই মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, ”সামিরুল, ওঁদের ফেরানোর ব্যবস্থা করো।”