সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
ভিন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্থার অভিযোগ নতুন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ঘটনায় দেখা গিয়েছে, শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার অপরাধে তাঁদের বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ, কয়েকজন ভারতীয় নাগরিককে সরাসরি বাংলাদেশে পুশ ব্যাকও করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে তোলার পাশাপাশি রাজ্যবাসীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন।
তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সংসদে কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রকের কাছে একাধিক লিখিত প্রশ্ন পেশ করেন। তাঁর প্রশ্নগুলির মধ্যে ছিল— দেশে মোট কতজন পরিযায়ী শ্রমিক রয়েছেন? বাংলার শ্রমিকরা ভিন রাজ্যে হেনস্থার শিকার হচ্ছেন কি না? হলে কতজন এমন সমস্যায় পড়েছেন? এবং এর বিরুদ্ধে কেন্দ্র কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
প্রাথমিকভাবে কেন্দ্রের উত্তরে জানানো হয়, অসংগঠিত শ্রমিকদের জন্য একটি জাতীয় ডাটাবেস ‘ই-শ্রম’ পোর্টাল চালু হয়েছে। ৫ অগস্ট পর্যন্ত এই পোর্টালে নথিভুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা সারা দেশে ৩০.৯৮ কোটি। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— কোন রাজ্যে কতজন বাংলার শ্রমিক হেনস্থার শিকার হয়েছেন— তার উত্তর মেলেনি।
কেন্দ্র জানিয়েছে, ‘আইনশৃঙ্খলা’ বিষয়টি রাজ্যের আওতাধীন। অর্থাৎ, যদি কোনও ভিন রাজ্যে বাংলার শ্রমিক হেনস্থার শিকার হন, তাহলে সেই রাজ্যের প্রশাসনকেই যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধীদের সনাক্তকরণ, গ্রেপ্তার এবং তদন্তের দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট রাজ্যের।
তবে কেন্দ্র দাবি করেছে, পরিযায়ী বা অসংগঠিত শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষায় আন্তরাজ্য পরিযায়ী শ্রমিক আইন, 1979 কার্যকর রয়েছে। এই আইনের অধীনে নিয়োগকর্তা বা ঠিকাদারদের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি, যাতায়াত খরচ, রেসিডেন্সিয়াল খরচ, চিকিৎসা সুবিধা এবং প্রতিরক্ষামূলক পোশাক প্রদান বাধ্যতামূলক। এই ব্যবস্থাপনার তদারকি করে সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস মেশিনারি। রাজ্য সরকারগুলিকেও এই আইন বলবৎ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে বাংলার হাজার হাজার শ্রমিক কাজের সন্ধানে দিল্লি, ওডিশা, মহারাষ্ট্র, অসম, কেরালা, হরিয়ানা-সহ বিভিন্ন রাজ্যে যান। নির্মাণ কাজ, শিল্প কারখানা, পরিবহণ, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য খাতে তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই শ্রমিকদের একাধিক হেনস্থার ঘটনার খবর সামনে এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের ভাষা ও পরিচয় নিয়ে অপমান করা হচ্ছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে শারীরিকভাবে আক্রমণও করা হয়েছে।
এই ধরনের পরিস্থিতির জেরে অনেক শ্রমিক ভিন রাজ্য থেকে ফিরে আসতে শুরু করেছেন। দিল্লি, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র— একাধিক জায়গা থেকে শ্রমিকরা বাংলায় ফিরছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন এবং জানিয়েছেন, রাজ্যে তাঁদের জন্য পৃথক প্রকল্প চালু হবে। এর ফলে শ্রমিকরা যাতে নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারেন এবং তাঁদের পরিবারগুলিও আর্থিকভাবে সুরক্ষিত থাকে, সে দিকেই জোর দেওয়া হবে।
পরিযায়ী শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতির একটি বড় স্তম্ভ। তাঁরা শুধু রাজ্য নয়, গোটা দেশের শিল্প ও নির্মাণ খাতে অবদান রাখেন। তাঁদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা প্রতিটি সরকারের দায়িত্ব। ভাষা, পরিচয় বা রাজ্যের ভিত্তিতে বৈষম্য কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যদি এই সমস্যা সমাধান না হয়, তাহলে শুধু শ্রমিকরাই নয়, শিল্প ও উৎপাদন খাতও বড় ধাক্কা খাবে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্ন এবং কেন্দ্রের অস্পষ্ট উত্তরের ফলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে— এখনো পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি সমন্বিত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথ উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা মেটানো সম্ভব নয়।
বাংলার শ্রমিকদের জন্য ভিন রাজ্যে কাজ করা একটি দীর্ঘকালীন বাস্তবতা। পশ্চিমবঙ্গে ২.৬৪ কোটির বেশি অসংগঠিত ও অভিবাসী শ্রমিক ই-শ্রম পোর্টালে নথিভুক্ত হয়েছেন। রাজ্যের শ্রম দপ্তরের মতে, এদের মধ্যে বড় অংশই অন্য রাজ্যে কর্মরত, বিশেষত কেরালা, মহারাষ্ট্র, দিল্লি, কর্ণাটক ও গুজরাতে। ভাষাগত বৈষম্য নিয়ে অভিযোগ থাকলেও সরকার দাবি করছে, ই-শ্রম পোর্টাল ও কেন্দ্রীয় আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থার ফলে এই সমস্যা অনেকটাই কমেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, উত্তর প্রদেশে সবচেয়ে বেশি অসংগঠিত শ্রমিক নথিভুক্ত হয়েছেন—৮.৩৯ কোটি। এর পরে রয়েছে বিহার (৩ কোটি), মধ্যপ্রদেশ (১.৮৯ কোটি), মহারাষ্ট্র (১.৭৮ কোটি), রাজস্থান (১.৪৯ কোটি)। পশ্চিমবঙ্গে নিবন্ধনের সংখ্যা ২.৬৪ কোটি, যা জাতীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে।