সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
ভোটার তালিকার সংশোধনের নামে অথবা ভোটার তালিকা থেকে ডুপ্লিকেট নাম বাদ দেওয়ার অজুহাতে দেশের বিশাল সংখ্যক দরিদ্র মানুষকে ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না। বর্তমানে কেন্দ্রে ভাজপা সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে জাতীয় নির্বাচন কমিশন যেভাবে বিহারের আদলে বাংলা সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া চালু করার সিদ্ধান্তর ঘোষণা করেছে তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানালেন ভারতের প্রাক্তন তিন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার।
ভারতের প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এসওয়াই কুরেশি বলেন, ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে ডুপ্লিকেট ভোটার বরাবরের সমস্যা। কিন্তু ভোটার তালিকায় ডুপ্লিকেট ভোটার মানেই সকলে যে জাল ভোটার তা কিন্তু নয়। এর জন্য আমাদের দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো অনেকখানি দায়ী। তবে এর জন্য একটা বিশাল সংখ্যক দরিদ্র মানুষকে সমস্যার মুখে ঠেলে দেওয়া যায় না। আগে কেউ যখন তামিলনাড়ু থেকে দিল্লি যেত কাজ করতে তখন সেখান থেকে ভোটার তালিকায় নাম কাটিয়ে তবে যেতে হত। তবে বেশিরভাগ পরিযায়ী শ্রমিকরাই গরিব। ফের ফিরে গিয়ে ভোটার তালিকায় নাম কাটানোর মতো সামর্থ তাদের নেই। এই সমস্যা সমাধানের জন্য এসওয়াই কুরেশির নেতৃত্বেই একটি রিফর্ম হয়েছিল। নয়া আবেদনপত্রে ভোটাররা নিজেদের আগেই কেন্দ্রের নাম উল্লেখ করতে পারবেন। নির্বাচন কমিশন নিজেই খতিয়ে দেখবে সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়া হয়েছে কি না। কুরেশি বলেন, আমি বিষয়টিকে সহজসাধ্য করেছিলাম। এখন অবশ্য সেটি কী অবস্থায় রয়েছে জানি না।
প্রসঙ্গত চলতি বছরেই নভেম্বরের শেষের দিকে অথবা ডিসেম্বরের প্রথমে যেখানে বিহারের বিধানসভা নির্বাচনে রয়েছে তার ঠিক কয়েক মাস আগে হঠাৎ করে বিহারে যেভাবে জাতীয় নির্বাচন কমিশন স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম রাতারাতি ভোটার তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলে দিয়েছে, তার কোন গণতান্ত্রিক দেশে সঠিক পদ্ধতি মেনে করা প্রক্রিয়া নয় বলেই দাবি করেন দেশের প্রাক্তন তিন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। এই প্রসঙ্গে ৩ প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার বলেন, বিস্তারিত এই সমীক্ষা অর্থবহ। এর পিছনে যুক্তি রয়েছে। তবে নির্বাচনের আগে হঠাৎ করে রাতারাতি সেটি শুরু হওয়া এবং যখন চতুর্দিক বন্যার কবলে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই।
প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ওপি রাওয়াত মনে করছেন, শুধু আধার কার্ডের বদলে ১১টির মধ্যে যে কোনও একটি নথি দেখাতে বলা গরিব মানুষদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, এই সময়ে বন্যা হচ্ছে চতুর্দিকে। বর্ষাও রয়েছে দেশে। গরিব মানুষরা আগে জীবন বাঁচাবে না অফিস থেকে অফিসে ঘুরে ঘুরে নথি জোগাড় করবে। ফলে এসআইআর-এর সময় নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে। বিহারের মতো বিশাল রাজ্যে অথবা ভারতের বড় রাজ্য গুলিতে ভোটার তালিকায় রাতারাতি বিশেষ নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়া চালানো দু-তিন মাসের কাজ নয়। এর জন্য নির্দিষ্ট পরিকল্পনা মেনে অন্ত ত দু-তিন বছর ধরে গোটা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। যখন নির্বাচন আসন্ন, ছোট ছোট ইস্যুও বড় হয়ে দাঁড়ায় এই স্পর্শকাতর সময়ে।
অন্যদিকে বিহারে যেভাবে প্রায় ৩৫ লক্ষ ভোটারের নাম রাতারাতি ভোটার তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক এই ভোটারকে তাদের নিজেদের নাম কেন ভোটার তালিকায় থাকা উচিত তা জানানোর জন্য কোন সুযোগ দেওয়া হয়নি তার তীব্র প্রতিবাদ করে আর এক প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা বলেন, যদি কোনও নাগরিক কোনও গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ করেন, তা হলে সেই অভিযোগের তদন্তের নির্দেশ দেওয়া নির্বাচন কমিশনের কর্তব্য।