শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
বাংলার ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়া সময়মতো সম্পন্ন করার জন্য ভিনরাজ্য থেকে বিচারক বা জুডিশিয়াল অফিসার আনার নজিরবিহীন রায় সুপ্রিম কোর্টের। প্রতিবেশী ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা থেকে প্রয়োজনীয় জুডিশিয়াল অফিসারদের আনার জন্য সংশ্লিষ্ট দুই হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর মামলার শুনানিতে নির্দেশ দিলেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি জে. ভিপুল পাঞ্চোলির বেঞ্চ। ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ডের জুডিশিয়াল অফিসারদের নিয়োগ করার জন্যও নির্দেশ দেন প্রধান বিচারপতি।
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জানিয়ে দেন, কাদের ব্যবহার করা হবে, তা কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি চূড়ান্ত করবেন , এটা তাঁর বিষয়। বিচারপতির থেকে ২২ তারিখ একটি চিঠি পেয়েছেন বলে প্রধান বিচারপতি বলেন। ৮০ লক্ষ অভিযোগ খতিয়ে দেখতে হবে। ২৫০ জন ডিস্ট্রিক্ট জাজ এবং অ্যাডিশনাল ডিস্ট্রিক্ট জাজ পদমর্যাদার জুডিশিয়াল অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে যদি একজন জুডিশিয়াল অফিসার দিনে ২৫০ অভিযোগের সমাধান করেন, তাহলেও পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে আশি দিন সময় লাগবে। প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করে দেন, ২৮ তারিখ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা ঘোষণা হবে। যা বাকি থাকবে সেই সাপ্লিমেন্টারি তালিকা নিয়মিত প্রকাশ করতে থাকবে কমিশন। সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে থাকা ভোটাররা চূড়ান্ত ভোটার তালিকার ভোটার হিসেবে চিহ্নিত হবে।
জুনিয়র এবং সিনিয়র সিভিল জাজ পদমর্যাদার অফিসার যাদের অন্তত তিন বছরের কাজের অভিজ্ঞতা আছে তাদের নিয়োগ করতে পারবেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। প্রধান বিচারপতির আরও পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজন পড়লে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশা হাইকোর্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে অবসরপ্রাপ্ত বা সার্ভিস জাজ চাইতে পারেন। সেক্ষেত্রে তাঁদের আসা-যাওয়ার খরচ এবং থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা কমিশনকেই করতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে, যাঁরা কাজ করবেন, তাঁদের সুবিধার জন্য এসআইআর-এর রুল সম্পর্কে অবগত করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, আধার কার্ড এবং অ্যাডমিট কার্ড গ্রহণযোগ্য ডকুমেন্টস হিসেবে মান্যতা পাবেন। ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ‘কাট অফ ডেট’ অনুযায়ী ডকুমেন্টস গৃহীত হবে। দায়িত্বে থাকা জুডিশিয়াল অফিসারকে তথ্য এবং ডকুমেন্টসের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে বোঝানোর দায়িত্ব থাকবে ইআরও এবং এইআরও-র।
প্রধান বিচারপতির এই নির্দেশের পর রাজ্যের তরফে আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ভিন রাজ্যের বিচারকরা বাংলা ভাষা বুঝবেন না। তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ডের মানুষ ভাষা বোঝেন। একসময় পুরো এলাকায় বাংলার ছিল। আমরা কলকাতা হাইকোর্ট থেকে একটি স্ট্যাটাস রিপোর্ট পেয়েছি। একজন অফিসার যদি ৫০ টি অভিযোগ খতিয়ে দেখেন, তাহলে মোট যত অফিসার নিয়োগ হচ্ছে, সেই অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে ৮০ দিন সময় লাগবে।’
সিভিল জাজ যাদের তিন বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাঁদেরও ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি।
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত মামলায় আধার জালিয়াতি নিয়ে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করল সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি ও বিচারপতি বিপিন পাঞ্চোলির বেঞ্চ স্পষ্ট জানায়, আধার কার্ডের অপব্যবহার বা জালিয়াতি রোখার প্রাথমিক দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের, আদালতের নয়। আদালত এই বিষয়ে তদন্তের সঠিক মঞ্চ নয় বলেও মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি।
বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায় অভিযোগ করেন, রাজ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য ব্যাপক হারে ভুয়ো আধার কার্ড তৈরি হচ্ছে। এর প্রেক্ষিতে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি জানান, অভিযোগ গুরুতর হলে আবেদনকারীকে জনপ্রতিনিধিত্ব আইন সংশোধনের জন্য কেন্দ্রের দ্বারস্থ হতে হবে। আধার কার্ড পরিচয়পত্র হলেও এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব দাবি করার কোনো আইনি অবকাশ নেই বলে আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে। ভোটার তালিকায় নাম নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে আধার কার্ডকে অন্যতম পরিচয়পত্র হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে আধিকারিকদের পূর্ণ অধিকার থাকবে ওই নথির সত্যতা যাচাই করার। কোনো নথি সন্দেহজনক মনে হলে তাঁরা অতিরিক্ত প্রমাণ দাবি করতে পারেন। শীর্ষ আদালতের এই অবস্থান স্পষ্ট করে দিল যে, প্রশাসনিক ও নীতিগত জটিলতার সমাধান সংসদেই খুঁজতে হবে।