সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘যতই দাও নোট, হবে নাকো ভোট। ওই নোটটা চুরি করা। পাপীদের হাত থেকে নোট নেবেন না, তা হলে সারাজীবন পস্তাতে হবে। আমরা এমন কিছু করব না, যাতে আমাদের চরিত্র, আদর্শ, দিশা নষ্ট হয়ে যায়।’ মঙ্গলবার পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা এবং গরবেতা বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থীদের সমর্থনে নির্বাচনী জনসভা থেকে এভাবেই বিজেপির বিরুদ্ধে টাকা দিয়ে ভোট কেনার বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা বলেন, ‘তৃণমূল না জিতলে আপনার ভাষা, বাসস্থান, ঠিকানা, ব্যবসা, মাছ-ভাত, আপনার নিজের খাদ্য থাকবে না। সব কেড়ে নেবে। রাজ্যটাকেই কেড়ে নেবে। কোথায় যাবেন? তখন ডিটেনশন ক্যাম্প করবে। আমরা থাকতে কোনও ডিটেনশন ক্যাম্প, কোনও এনআরসি করতে দেব না। এসআইআর-টা ভোটের তিন মাস আগে চালাকি করে করেছে। ছলনাধারী, ভোটকাটারি, অত্যাচারী, স্বৈরাচারী বাংলাবিরোধী এই বিজেপি-কে একটি ভোটও দেবেন না। খেলা তো হবেই। খেলা তো শুরু হয়ে গিয়েছে। খেলাটা বাকি কোথায়! ২০২৪ সালে আপনারা সকলে ভোট দিয়েছেন। মোদীজি ওই ভোটে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। অমিত শাহ নির্বাচিত হয়েছেন ওই লিস্টে। তা হলে পশ্চিমবঙ্গকে টার্গেট করে ভোটের তিন মাস আগে আপনাকে স্পেশ্যাল রিভিশন করতে হল কেন! ২০০২ সালের পরে আপনি এত বছর কেন করেননি।’
পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা বিধানসভা কেন্দ্রে কী কী উন্নয়নমূলক কাজকর্ম হয়েছে, সেই খতিয়ান তুলে ধরেন মমতা। আইটিআই, সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র, রাস্তা এবং সেতু নির্মাণের কথা উল্লেখ করেন তিনি। জানান, গড়বেতায় জলস্বপ্ন প্রকল্পে ৩৫টি কাজ হয়েছে। বাস টার্মিনাস তৈরির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি তৃণমূল বাংলার ক্ষমতায় আসার আগে গড়বেতা লালগড় সহ চন্দ্রকোনা এবং পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামের অন্তর্গত জঙ্গলমহলে যে সন্ত্রাসের পরিবেশ ছিল সেই প্রসঙ্গ তুলে ধরে মমতা আজ বলেন, ‘একসময় এই সব অঞ্চল সন্ত্রাসের অঞ্চল ছিল। মানুষ বেরোতে পারতেন না। চার দিকে রক্ত আর রক্ত। বছরে ৪০০-র বেশি মানুষ মারাও গিয়েছেন। আমাদের অনেক পুলিশকর্মীকেও একসঙ্গে খুন করা হয়েছিল। আমি তার পর গিয়েছিলাম। আপনারা সকলে লালগড়ের ঘটনা জানেন। নেতাইয়ের ঘটনা জানেন। গড়বেতার একটি ঘটনা আপনাদের কাছে বলি। একজন বিধবা মা আমাকে বললেন, মা, আমাকে একটা তৃণমূলের পতাকা আর একটা বন্দুক দিতে পারো! আমি বললাম, কেন মা, বন্দুকের কথা কেন বলছ? উনি বললেন, আমার দুটো ছেলেকে খুন করেছে। আমি এক হাতে তৃণমূলের পতাকা নিয়ে, আর এক হাতে বন্দুক নিয়ে এর প্রতিশোধ নেব। আমি বললাম, তুমি মাথা ঠান্ডা করো। কিন্তু তুমি এক দিন না এক দিন বিচার পাবে। লালগড়ের দিনগুলো আমি কোনও দিন ভুলি না, আমার মাথায় থাকে।’
বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের যে সমস্ত খবর আসছে তা অবিলম্বে মিটিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়ে দলীয় নেতাদের উদ্দেশে মমতা বলেন, ‘সকলকে নিয়ে কাজ করুন। এটা আমার নির্দেশ। আমি সেই কর্মীকে ভালবাসি যে নেতাগিরি না করে, মানুষের পায়ে বসে থাকে। মানুষের সাথে, মানুষের দুঃখে সুখে কাজ করে। তাদের আমি বিশ্বাস করি। তারা আমাদের সম্পদ।’
চলতি মরশুমে আলুর রেকর্ড ফলনে চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল চাষিদের কপালে। আশঙ্কা সত্যি করেই আলুর দাম কমে যায়। বাজারে আলুর দাম কমতেই মাথায় হাত পড়েছে আলু চাষিদের। রাজ্যের একাধিক জেলায় আলু চাষ করে এখন গাঁটের কড়ি গুনতে হচ্ছে বহু চাষিকে। আর এই আবহেই আলু চাষিদের বড় বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
মঙ্গলবার গড়বেতা হাইস্কুল ময়দানের জনসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আলুচাষিরা অনেকেই প্রবলেমে আছেন। মনে রাখবেন, আপনাদের চিন্তা করার কোনও কারণ নেই। কৃষকদের যেমন শস্যবিমা আছে, তেমন আলুচাষিদের জন্যও আমরা শস্যবিমা করেছি। কারও একটি আলুও নষ্ট হলে, তিনি ক্ষতিপূরণ পাবেন। মনে রাখবেন, কেউ চাষির পেটের ভাত মারবেন না। তা হলে কিন্তু আমি ভয়ানক হয়ে যাই। আলু নষ্ট হলে আপনি ক্ষতিপূরণ পাবেন। আপনাদের শস্য বীমা করা আছে। আমরা আলু কিনব। সেগুলি রাখার জন্য কোল্ড স্টোরেজ আছে। বিজেপি নেতাদের বলছি আলু নিয়ে রাজনীতি করবেন না। আমরা ৩০ শতাংশ কোল্ডস্টোরেজ করেছি যাতে আমরা আলু কিনে রাখবো।আইসিডিএস-মিড ডে মিলের জন্য আলু কেনা হবে। এমনকি কোনও চাষি যদি বাইরেও আলু বিক্রি করতে চান, তাহলেও সরকারের কোন আপত্তি নেই। যাদের ক্ষতি হয়েছে তারা ক্ষতিপূরণ পাবেন। নিশ্চিন্ত থাকুন।’
বিজেপি ও কমিশনকে তোপ দেগে বলেন, ‘ওরা বাংলাকে সহ্য করতে পারে না। বাংলার উপর এত রাগ কেন? ধর্ম নিয়ে ভাগাভাগি করে যাচ্ছে। মহিলা ও কৃষক বিরোধী বিজেপি। এসআইআর মানেই সর্বনাশ। রাজবংশীদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বেছে বেছে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁদের নাম তোলার ব্যবস্থা করতে হবে। আমি বিনা পয়সার আইনজীবীর ব্যবস্থা করে দেব। বাংলাকে টার্গেট করেছে কারণ বাংলার মানুষ মাথা সোজা রাখে। ওরা বাংলা বললেই মারছে। ওরা বস্তায় বস্তায় ফর্ম জমা দিয়েছে। বাংলার বাইরের লোকদের নিয়ে এসে নাম তুলছে। ভোট রক্ষা করতে হবে আপনাদের। আর কত লাইন দেবেন। এবার আপনাদের প্রতিবাদ করতে হবে। এরপরে এনআরসি হবে। এখনও নাম বাদ দিচ্ছে। লিস্টে নাম থাকলেও আপনি জানেন না ভোট দিতে পারবেন কিনা।’