সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
বিশ্বজুড়ে ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন আশা জাগিয়েছে রাশিয়ার বৈজ্ঞানিক সাফল্য। সম্প্রতি রাশিয়ার ফেডারেল মেডিক্যাল অ্যান্ড বায়োলজিক্যাল এজেন্সি (FMBA) দাবি করেছে যে তারা ক্যান্সারের একটি বিশেষ ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। তবে এই ভ্যাকসিন অন্য যেকোনও প্রতিষেধকের মতো নয়। সাধারণত ভ্যাকসিন মানেই একটি রোগ প্রতিরোধে কাজ করে—যেমন টিটেনাস বা পোলিও ভ্যাকসিন। কিন্তু রাশিয়ার ক্যান্সার ভ্যাকসিন প্রতিরোধমূলক নয়, বরং চিকিৎসামূলক (Therapeutic Vaccine)। অর্থাৎ, এটি ক্যান্সার আটকাবে না, বরং আক্রান্ত রোগীর শরীরের ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করবে।
ক্যান্সার ভ্যাকসিন কীভাবে আলাদা?
চিকিৎসক ও গবেষক ডা. দীপ্তেন্দ্র সরকারের মতে, এই ভ্যাকসিনকে প্রিভেন্টিভ ভ্যাকসিনের সঙ্গে তুলনা করা ভুল হবে। যেমন টিটেনাস ভ্যাকসিন আগে থেকে নিলে রোগ আটকানো যায়, কিন্তু কারও টিটেনাস হলে ইমিউনোগ্লোবিন ব্যবহার করা হয় রোগ সারাতে। রাশিয়ার ক্যান্সার ভ্যাকসিনও তেমনই—এটি ক্যান্সার প্রতিরোধ করবে না, বরং ক্যান্সার আক্রান্তদের শরীরে ব্যবহার হবে এবং টিউমারকে শুকিয়ে দিতে সাহায্য করবে।
ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা: প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা ভ্যাকসিন
এই ভ্যাকসিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদাভাবে তৈরি হবে। প্রক্রিয়াটি হবে এমন—
1. রোগীর শরীর থেকে কিছু ক্যান্সার কোষ বের করে আনা হবে।
2. ল্যাবরেটরিতে সেই কোষ থেকে অ্যান্টিজেন আলাদা করা হবে।
3. সেই অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে কাজ করার মতো অ্যান্টিবডি তৈরি করা হবে।
4. শেষ পর্যন্ত সেই অ্যান্টিবডি আবার রোগীর শরীরে প্রয়োগ করা হবে।
এই অ্যান্টিবডি রোগীর শরীরের ক্যান্সার কোষের অ্যান্টিজেনকে টার্গেট করে ধ্বংস করতে শুরু করবে। অর্থাৎ, কোনও প্রস্তুত ভ্যাকসিন মজুত থাকবে না, প্রতিটি ক্যান্সার আক্রান্তের জন্য আলাদাভাবে টেলর-মেড ভ্যাকসিন বানাতে হবে।
ইমিউনোথেরাপির নতুন দিগন্ত
গত এক দশকে ক্যান্সার চিকিৎসায় ইমিউনোথেরাপির প্রতি জোর বেড়েছে। ডা. সরকার বলেন, ক্যান্সার কোষের আচরণ অনেকাংশেই নির্ভর করে তার মাইক্রো-এনভায়রনমেন্ট বা শরীরের পরিবেশের উপর। একই ক্যান্সার কোষ এক দেশে একরকম আচরণ করছে, অন্য দেশে আবার ভিন্নভাবে। তাই পরিবেশ পরিবর্তন করে বা ইমিউনো সিস্টেম সক্রিয় করে ক্যান্সার কোষকে দুর্বল করে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। রাশিয়ার এই ভ্যাকসিন সেই প্রচেষ্টারই বড় উদাহরণ।
রাশিয়ার দাবিকৃত ফলাফল
রাশিয়ান বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেছে—
এই ভ্যাকসিন ব্যবহারে টিউমারের আকার ৬০% থেকে ৮০% পর্যন্ত ছোট হয়েছে।
ক্যান্সারের বৃদ্ধি বা বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও অনেকটা বেড়েছে।
প্রথমে এই ভ্যাকসিন কোলন ক্যান্সার চিকিৎসায় ব্যবহার করা হবে বলে দাবি করা হয়েছে। ভবিষ্যতে অন্যান্য ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও এটি প্রয়োগ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কতটা নিরাপদ এই ভ্যাকসিন?
FMBA প্রধান ভেরোনিকা স্কভোসোভার জানিয়েছেন, একাধিক প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এই ভ্যাকসিন সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি বারবার ডোজ দেওয়ার পরেও কোনও বড় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তবে এখনও আন্তর্জাতিকভাবে বড় পরিসরে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বাকি আছে।
সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ
যদিও এই আবিষ্কার অত্যন্ত আশাজাগানিয়া, তবুও কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে—
প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা ভ্যাকসিন তৈরি করতে সময় ও খরচ অনেক বেশি।
বড় পরিসরে উৎপাদন করা কঠিন।
বিভিন্ন ক্যান্সারের ধরন অনুযায়ী ফল ভিন্ন হতে পারে।
রাশিয়ার ক্যান্সার ভ্যাকসিন চিকিৎসা বিজ্ঞানের জগতে নতুন আশার আলো। এটি প্রতিরোধ নয়, বরং ক্যান্সার আক্রান্তের শরীরে টিউমার ধ্বংস করতে তৈরি একটি বিশেষ ভ্যাকসিন। ব্যক্তিগতকৃত বা টেলর-মেড চিকিৎসা হিসেবে এটি ক্যান্সার থেরাপিতে নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। তবে বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগের আগে আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছেন চিকিৎসক ও গবেষকরা।
এই ভ্যাকসিন যদি বিশ্বব্যাপী সফলভাবে ব্যবহার শুরু হয়, তবে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মানবজাতি পাবে এক যুগান্তকারী অস্ত্র।