বীরভূমের ‘পাথরসম্রাট’ টুলু মণ্ডলের বিপুল সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের দাবি প্রশাসনের। সাংবাদিক বৈঠকে শুভেন্দুর অভিযোগ—‘উপরের স্তরের মদত ছাড়া এত বড় চক্র চলতে পারে না’।
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
বীরভূম (Birbhum)-এর বিতর্কিত ‘পাথরসম্রাট’ টুলু মণ্ডল (Tulu Mondal)-কে ঘিরে নতুন করে উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি। শুক্রবার নবান্ন (Nabanna)-এ সাংবাদিক বৈঠকে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তাঁর দাবি, টুলু মণ্ডলের নামে ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে থাকা বিপুল সম্পত্তি এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য সামনে এসেছে। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, এত বড় অবৈধ আর্থিক সাম্রাজ্য গড়ে ওঠা তৎকালীন সরকারের নীরব সমর্থন ছাড়া সম্ভব ছিল না।
শুভেন্দুর বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। কারণ, তাঁর অভিযোগের নিশানায় রয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
কী দাবি করলেন মুখ্যমন্ত্রী?
সাংবাদিক বৈঠকে শুভেন্দু জানান, তদন্তে টুলু মণ্ডল এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের নামে থাকা একাধিক সম্পত্তি ও বিপুল আর্থিক সম্পদের হদিস মিলেছে। তাঁর দাবি, ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে থাকা ৯৩ কোটি টাকা ফ্রিজ করা হয়েছে। এছাড়াও ৫৩ লক্ষ টাকা নগদ, ২৬৮ গ্রাম সোনা, ৪০০ গ্রাম রুপো, ৬৩ গ্রাম প্ল্যাটিনাম, তিনটি টাকা গোনার মেশিন, কম্পিউটার, সিপিইউ এবং দুটি পেনড্রাইভও উদ্ধার হয়েছে বলে জানান তিনি।
সবচেয়ে বেশি চর্চায় এসেছে যানবাহনের সংখ্যা। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, তদন্তে বিএমডব্লিউ (BMW) ও অডি (Audi)-সহ মোট ২৪২টি গাড়ি এবং ৮৩টি ট্রাক ও ডাম্পার বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এত বিপুল সম্পদের উৎস নিয়েই এখন তদন্ত এগোচ্ছে বলে প্রশাসনের দাবি।
২১টি সম্পত্তির খোঁজ, ৩০০ বিঘা জমি
শুভেন্দুর বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তে মোট ২১টি সম্পত্তির সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৭টি বাড়ি, ১টি ফার্মহাউস, ২টি পেট্রল পাম্প, ১টি পার্কিং কমপ্লেক্স, ২টি স্টোন ক্রাশার এবং প্রায় ৩০০ বিঘা জমি।
তাঁর দাবি, এই সম্পত্তিগুলি আইন অনুযায়ী বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাশাপাশি পাথর ও বালি খাদান সংক্রান্ত আর্থিক অনিয়ম, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি এবং জোর করে জমি দখলের অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
প্রাক্তন সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ
সাংবাদিক বৈঠকে শুভেন্দুর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য ছিল রাজনৈতিক দায় নিয়ে। তিনি বলেন, “এত বড় দুর্নীতি তৎকালীন সরকারের সমর্থন ছাড়া চলতে পারে না। এতদিন ধরে এই ধরনের কার্যকলাপ চলেছে, অথচ কেউ জানতেন না—এটা বিশ্বাস করা কঠিন।”
তাঁর আরও দাবি, প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরের নজরদারি কার্যকর থাকলে এত বড় আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠা সম্ভব হতো না। সেই কারণেই তিনি প্রাক্তন সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই অভিযোগগুলি মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক বক্তব্য। এখনও পর্যন্ত আদালতে এই অভিযোগগুলির সত্যতা প্রমাণিত হয়নি এবং তদন্তও চলমান।
মূল অভিযুক্ত এখনও অধরা
প্রশাসনের দাবি, টুলু মণ্ডল এখনও পলাতক। তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য একাধিক জায়গায় তল্লাশি চলছে। তদন্তকারীদের মতে, মূল অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে আর্থিক লেনদেন, সম্পত্তি ক্রয় এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান
সাংবাদিক বৈঠকে শুভেন্দু স্পষ্ট করে দেন, এই মামলায় কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তিকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, “যারা এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মূল মাথাদেরও খুঁজে বের করা হবে।”
তিনি আরও দাবি করেন, সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে এবং বেআইনি উপায়ে বিপুল সম্পত্তি গড়ে তোলা হয়েছে। সেই কারণেই পুরো বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে
টুলু মণ্ডলকে ঘিরে এই তদন্ত এখন শুধুমাত্র একটি আর্থিক দুর্নীতির মামলা নয়, বরং রাজ্যের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ইস্যুতেও পরিণত হয়েছে। একদিকে প্রশাসনের তদন্ত, অন্যদিকে প্রাক্তন সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ—দুই মিলিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও বাড়তে পারে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের দাবি, তদন্ত নিরপেক্ষভাবে হওয়া উচিত এবং সমস্ত তথ্য আদালতের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ, শেষ পর্যন্ত তদন্তের ফল এবং আদালতের পর্যবেক্ষণই এই মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

এখন নজর তদন্তে
এই মুহূর্তে তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাজেয়াপ্ত সম্পত্তির উৎস, আর্থিক লেনদেনের নথি এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের ভূমিকা। প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং তদন্তে নতুন কী তথ্য উঠে আসে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের।
৯৩ কোটি টাকার সম্পদ, শতাধিক গাড়ি এবং বিস্তীর্ণ জমির দাবি ঘিরে রাজ্য রাজনীতি ইতিমধ্যেই সরগরম। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনও উত্তরহীন—তদন্তের শেষ প্রান্তে পৌঁছে আর কার কার নাম সামনে আসবে?