সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
“নেতাজি ইন্ডোরে মিটিংয়ের পর, মুখ্যমন্ত্রী বার্তা দেওয়ার পর, ডিআই অফিসে গেছিলেন কেন? ঘটনাটা দুর্ভাগ্যজনক এটা যেমন সত্যি, তেমন এটাও সত্যি তাঁদের নেত্রীস্থানীয়র সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। আমরা বলেছি সর্বোতভাবে, মানবিকভাবে, আইনিভাবে কীভাবে বঞ্চিতদের চাকরি ফেরত দেওয়া যায় দেখা হবে।” কসবা ডিআই অফিসের সামনে চাকরি হারাদের একাংশের বিক্ষোভ প্রসঙ্গে এমন প্রশ্ন করলেন রাজ্যের শিক্ষা মন্ত্রী ব্রাত্য বসু।
বুধবার দুপুরে কসবার ডিআই অফিসের সামনে ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটে। গেট টপকে ভিতরে ঢোকে চাকরিহারারা। তুমুল ধস্তাধস্তির পরিস্থিতি তৈরি হয়। শিক্ষকদের উপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। অফিসের ভিতরে লাঠি চলে চাকরিহারাদের উপর। লুটিয়ে পড়েন একাধিক শিক্ষক। এমনকী তাঁদের লাথিও মারে পুলিশ। এই আবহে শিক্ষামন্ত্রী প্রশ্ন তুললেন কেন চাকরিহারারা গিয়েছিলেন সেখানে। চাকরি বাতিল ইস্যুতে এদিন জেলায় জেলায় ডিআই অফিস ঘেরাওয়ের ডাক দেন চাকরিহারারা। কসবায় ব্যারিকেড টপকে ডিআই অফিসে ঢোকার চেষ্টা করলে চাকরিহারাদের বাধা দেয় পুলিশ। শুরু হয় পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক ধস্তাধস্তি। এরপরই শুরু হয় লাঠিচার্জ। এদিন ব্রাত্য বসু বলেন, “যে সরকারের কাছে দাবি করছেন, শিক্ষা দফতর, এসএসসি পাশে আছে, সেখানে আন্দোলন বিক্ষোভ তো কিছুদিন স্থগিত রাখা যায়। এর জন্য তো দিন পড়ে যায়। আমার মনে হয় আরেকটু ধৈর্য্য রাখা উচিত। ওঁরা বৈঠকে বসতে চাইছেন, আবার ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের দিকে যাচ্ছেন, দুটো তো একসঙ্গে হতে পারে না। আমরা সাহায্য করব, বদ্ধপরিকর। পুলিশ কী করেছে তা নিয়ে তো মন্তব্য করতে পারি না। বারবার বলছি পোর্টাল আপডেট করব। কোথাও বেতন বন্ধের কথা আমার অন্তত জানা নেই।”
এদিন লাঠির আঘাতে লুটিয়ে পড়েন এক চাকরিহারা। সহকর্মীকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেলেন যাঁরা, তাঁরাও রেহাই পেলেন না। আন্দোলনকারী চাকরিহারা বলেন, “সেনসিটিভ জায়গা দেখে দেখে লাঠি মারছে। ভীষণ রকম অসভ্য, বর্বরের মতো আচরণ। এটা কি সরকারি নির্দেশ ছাড়া হয়। উনি ওখানে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, আর এখানে লাঠিচার্জ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। পুলিশের লাঠির আঘাতে, আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন চাকরিহারা। এক আন্দোলনকারী বলেন, “এই পরিস্থিতি সত্যি লজ্জাজনক। এখানে বলার কিছু নেই। পুলিশ, যারা দাগি আসামিদের প্রটেকশন দিয়ে নিয়ে যায়, তারা আজ শিক্ষকের গায়ে হাত তুলছে। আমাদের অপরাধ কী? আমরা সেটাই জানতে এসেছি। কেন আজকে আমরা চাকরিহারা? কেন আমরা আজকে রাস্তায়? আমাদের তো এখানে থাকার কথা নয়। কেন? কেন আমরা আজকে এখানে বসে রয়েছি? আমাদের অপরাধটা কোথায়, সেটাই আমরা জানতে এসেছি। কিন্তু, তার ফলে যে আমাদেরকে এভাবে অপদস্তু, হেনস্থা হতে হবে, এটা আমরা ভাবিনি।”
অন্যদিকে এদিনই স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে বৈঠক ছিল প্রাক্তন বিচারপতি তথা বিজেপি নেতা অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের। তারপর তাঁর শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর সঙ্গে বৈঠকের কথা ছিল। মুখ্যমন্ত্রীকে একটি চিঠি দেওয়ারও কথা ছিল তাঁর। কিন্তু অভিজিত জানালেন, যেভাবে শিক্ষকদের ওপর লাঠিচার্জ হয়েছে, তার প্রতিবাদে সেই বৈঠক বাতিল করেন তিনি। শিক্ষামন্ত্রীর তরফে ফোন করে বিষয়টি জানিয়ে দেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে এদিন বিকাশভবনের বাইরে শিক্ষামন্ত্রী বললেন, “আজকে উনিই আসতে চেয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। ওনার কথা মতো, দল মতের ঊর্ধ্বে উঠে, ওনার দলীয় পরিচয় ভুলে গিয়ে বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত হয়। সাংসদ প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়কে বলেছিলাম, মিডিয়ার কাছে আবেদন না করে সরসারি লিখিতভাবে আবেদন করুন। আমার কাছে মুখ্যমন্ত্রীকে দেওয়া সেই চিঠিই দিতে আসার কথা ছিল। তারপরও এলেন না।”
অভিজিতকে কটাক্ষ করতে গিয়ে লোককবিতার পংক্তি উল্লেখ করেন ব্রাত্য। তিনি বলেন, “তুমি সর্প হয়ে দংশন করো, ওঝা হয়ে ঝাড়ো। উনিই বলেছিলেন আসবেন, মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দেবেন বলেছিলেন, তারপর ব্যাকআউট করলেন। আর যে কারণ দেখিয়ে করলেন, সেটা কোনও যুক্তি হতে পারে না।” ব্রাত্যর পাল্টা প্রশ্ন, যদি প্রতিবাদ দেখাতেই হত, যে কারণে এই বৈঠকে এলেন না, তাহলে তিনি কমিশনে কেন গিয়েছিলেন?

অভিজিতের ওপর দলের তরফ থেকে কোনও চাপ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ব্রাত্য। তিনি বলেন, “আমি ওনারই দেওয়া সময়ে বসে ছিলাম। উনি দলীয় কোনও প্রতিবন্ধতায় পড়লেন কিনা, এরকম করলে পরে কোনও অসুবিধা হত কিনা, উনিই বলতে পারবেন।”
তবে অভিজিতের স্পষ্ট বক্তব্য, তিনি লাঠিচার্জের প্রতিবাদেই এই বৈঠক বাতিল করেছেন। তিনি বলেন, “রাত তিনটে পর্যন্ত বসে আমি ওটাকে ড্রাফট করেছিলাম। কিন্তু স্কুল সার্ভিস কমিশনের বৈঠক ছেড়ে উঠছি, তখন শুনলাম, পুলিশ নৃশংসভাবে লাঠি চালিয়েছে। পুলিশ প্রচণ্ড মারধর করেছে? ওঁরা কি ক্রিমিন্যাল? যাঁরা ক্রিমিন্যাল তাঁরা তো মন্ত্রিসভায় বসে রয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রীর ব্রাত্য বসুর সঙ্গে বৈঠকে রাজি ছিলাম। কিন্তু পুলিশ শিক্ষকদের মারে, তখন আর কী ভদ্রভাবে কথা বলব?”