সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
“আমি উস্কানি মূলক কথা বলতে আসিনি। সব ধর্মকে আমরা সমান মর্যাদা দিই। আমি শান্তি চাই।” নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে ইমামদের বৈঠকে এভাবেই রাজ্যে শান্তি স্থাপনের জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রশ্ন তুললেন, “তাড়াহুড়ো করে ওয়াকফ আইন পাস করানো হল কেন?”
ওয়াকফ সংশোধনী আইন নিয়ে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি তথা ইমাম মোয়াজ্জেমদের নিয়ে সম্মেলন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। মুর্শিদাবাদের ঘটনা নিয়ে কংগ্রেসকে দায়ী করলেন মমতা। বললেন, “যেখানে হামলা হয়েছে সেটা মালদা আসন। মুর্শিদাবাদ নয়। যেখানে গন্ডগোল হয়েছে, কংগ্রেস জিতেছে। ওদের উচিত ছিল পরিস্থিতি শান্ত করা।”
এরইমধ্যে হিংসায় আক্রান্তদের জন্য ক্ষতিপূরণেরও ঘোষণা করলেন। মৃতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেবে সরকার। অন্যদিকে যাদের বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে তাঁদের বাংলার আবাস প্রকল্পে বাড়ি করে দেওয়া হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেন মমতা। এদিন নেতাজি ইন্ডোর থেকে মমতা বলেন, “আমি কোনও সম্প্রদায় হিসাবে দেখি না, মানুষ হিসাবে দেখি। যারা মারা গিয়েছে তাঁদের প্রত্যেকের পরিবারকে আমাদের সরকার ১০ লক্ষ টাকা করে দিয়ে সাহায্য করবে। যাঁদের বাড়ি ভেঙেছে তাঁদের সবাইকে বাংলার বাড়ি করে দেওয়া হবে। যাঁদের দোকান নষ্ট হয়েছে তার হিসাব-নিকেশ করে মুখ্যসচিব দায়িত্ব নিয়ে কাজটা করবেন।”
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, হামলার পেছনে তৃণমূল কংগ্রেস থাকলে তৃণমূলের পার্টি অফিস হামলা হত না। তৃণমূল বিধায়কদের বাড়িতে হামলা হয়েছে বলে দাবি মমতার। তিনি বলেন, “ওয়াকফ নিয়ে প্ররোচনামূলক কথা হয়েছে। উস্কানিমূলক কথা বলতে আসিনি। ইমামদের শ্রদ্ধা করি। পুরোহিতদের শ্রদ্ধা করি। সর্বধর্ম সমন্বয়ে বিশ্বাস করি। হাতজোড় করে বলছি, অশান্তি কেউ করতে চাইলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করুন।”
ইমাম-মোয়াজ্জেমদের সঙ্গে বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “অশান্তিতে বাংলাদেশের হাত থাকলে, তার জন্য কে দায়ী? এর জন্য পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকার দায়ী। কেন্দ্রকে বললেন, ‘ভাগ না করে, বিজেপি ভারতকে জোড়ো’। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন বলেন, “আমি উস্কানিমূলক কথা বলতে আসিনি। আমার যেমন যে কোনও মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে অধিকার নেই। তেমন আপনারও অধিকার নেই কারও ব্যক্তিগত বা ধর্মীয় সম্পত্তি অধিকার করা।”
বিজেপিকে নিশানা করে বললেন, সংবিধানকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে, আম্বেদকরের তৈরি সংবিধান মানা হচ্ছে না। সংবিধানে বদলের অভিযোগে বিজেপিকে আক্রমণ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “বাবা আম্বেদকর যে সংবিধান তৈরি করেছিলেন, তা ভারতের সংবিধান। বিজেপির সংবিধান বলা যায় না। তবু সংবিধান নিয়ে কাটাছেঁড়া চলছে। ১০ বছরে কী করেছেন? ওষুধের দাম থেকে গ্যাসের দাম, জ্বালানির দাম বাড়িয়েছেন। কটা চাকরি দিয়েছেন? বাংলার সংবাদমাধ্যম নয়। বাইরের কিছু মিডিয়াকে বিজেপি নিয়ন্ত্রণ করে। তারা ভুয়ো ভিডিও দেখায়। কর্ণাটক, উত্তরপ্রদেশের ভিডিও বাংলার নাম করে চালাচ্ছে।” অশান্তি করতে বিজেপি প্ররোচনা দিচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “বিজেপি বলে আমি নাকি দুর্গাপুজো করতে দিই না। ঘরে ঘরে সরস্বতী পুজো হয়। ওরা বলে আমি নাকি করতেই দিই না।” ওয়াকফ নিয়ে কেন্দ্র তাড়াহুড়ো করে বিল পাস করিয়েছে বলে দাবি মমতার। তৃণমূল সুপ্রিমেো বলেন, “ভারত সরকারকে চ্যালেঞ্জ করছি, এত তাড়াহুড়ো করার কী ছিল? বাংলাদেশের পরিস্থিতি জানেন না? ইউনূসের সঙ্গে গোপন বৈঠক করুন। দেশের ভালো হলে খুশি হব।”
সরাসরি বিজেপিকে দুষে মুখ্যমন্ত্রী বললেন, “বিজেপি ফেক নিউজ ছড়াচ্ছে, ফেক ভিডিও দেখাচ্ছে। বাংলার কথা বলে, অন্য রাজ্যের ভিডিও দেখানো হচ্ছে।” মুর্শিদাবাদের অশান্তি নিয়েও কেন্দ্রকেই দুষলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। গোটাটাই বিজেপির ষড়যন্ত্র বলে দাবি করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আপনাদের প্ল্যানিং কী? বাংলাদেশ থেকে লোক এনে দাঙ্গা করা? মুর্শিদাবাদে অশান্তির ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক বাংলাদেশি যোগের ইঙ্গিত দিয়েছে। কেন আপনাদের লোক এসে দাঙ্গা করে পালিয়ে গেল? ভারতকে ভাগ করো না, হিন্দুস্তানকে জুড়ুন। বিভাজনের বদলে ঐক্য তৈরি করুন। বিভাজনের রাজনীতি দেশকে টুকরো করে দেবে।”
হিন্দুদের উৎসবে সবাই সামিল হন, মুসলিমদের উৎসবে অংশ নিলে দোষ কোথায়? প্রশ্ন তুলে মোদীর উদ্দেশ্যে মমতা বলেন, “সৌদি আরবে গিয়ে আপনি কোলাকুলি করলে তখন ভুল হয় না? তখন নরেন্দ্র মোদী কেন নরেন্দ্র ইসলাম হবেন না? আর মমতা গেলেই পদবী বদলে দেন।”
যদিও পর মুহূর্তেই নিজের বলা কথা প্রত্যাহার করে নেন মমতা। বলেন, “সৌজন্য বোধের কারণে আমার বলা নরেন্দ্র ইসলাম শব্দটি আমি প্রত্যাহার করে নিলাম।” এদিন নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে ইমামদের সঙ্গে বৈঠকে স্টেজেই হিন্দু, মুসলিম, শিখ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের পাশে নিয়ে এক ফ্রেমে রেখে সর্বধর্ম সমন্বয়ের বার্তাও দিতে চাইলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রধানমন্ত্রীকে নিশানা করে মমতার আরও আক্রমণ, “অমিত শাহকে কেউ চেনেন না। ওঁকেই চেনেন, যাকে গুজরাটের দাঙ্গায় দেখা গিয়েছে। দাঙ্গা করতে করতে যারা ক্ষমতায় আসেন, তার কীকরে বুঝবেন, মানুষের রক্তের দাম অনেক বেশি। এরা বোঝে না। তাই ওদের বোঝাতে গেলে লড়াই করার শক্তি দিতে হয়। বাংলায় চুপ থাকুন। এরপর অভিন্ন দেওয়ানি বিধি আনবে। যদিও চ্যালেঞ্জ হবে। ওয়াকফও চ্যালেঞ্জ হবে। সংবিধানকেও সংশোধন করা হবে।”

মমতা আরও বলেন, “এরপর বলছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি আনবে, খ্রিষ্টানরা চুপ থাকবে? মুসলিমদের না হয় বিরোধী মনে করেন। কিন্তু দুবাই গেলে, সৌদি আরব গেলে কাদের সঙ্গে গলা মেলান? কাদের আতিথেয়তা গ্রহণ করেন? অনেক হিন্দুও ওয়াকফ সম্পত্তি দান করেছে। ওয়াকফ আইনে যা করেছে, আমরা সমর্থন করিওনি, করবও না। চন্দ্রবাবু নায়ডু, নীতীশ কুমার ক্ষমতার লোভে চুপ থেকেছেন।”
ওয়াকফ ইস্যুতে সম্প্রতি বাংলার মুর্শিদাবাদ-সহ বেশ কয়েকটি জেলা অশান্ত হয়ে উঠেছিল। মুর্শিদাবাদের একটা অংশে আন্দোলনের নামে গুন্ডামি চলেছে বলেও অভিযোগ। অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছিল নবাবের জেলা। পুলিশ-জনতা খণ্ডযুদ্ধে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। প্রাণ গিয়েছে তিনজনের। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বলেই দাবি পুলিশের। এই পরিস্থিতিতে বুধবার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে ওয়াকফ ইস্যুতে ডাকা সমাবেশে যোগ দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানেই মুখ্যমন্ত্রী জানান, সংসদে ওয়াকফ বিলের প্রতিবাদে সুর চড়িয়েছিলেন তৃণমূল সাংসদরা। কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি বলেই দাবি করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই তাঁর মুখে শোনা যায় এসএসসির চাকরি বাতিল প্রসঙ্গ। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “২৬ হাজার চাকরি বাতিল হল একতরফা। অনেক সময় বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদে।” অর্থাৎ এদিন ফের তিনি দাবি করলেন, চাকরি বাতিলের নেপথ্যে বাম-বিজেপির চক্রান্ত ও আদালতের এক পাক্ষিক মনোভাব। বললেন, “ওরাই চাকরি খেয়েছে, আবার ওরাই কথা বলছে।”