লাগাতার বৃষ্টির পাশাপাশি দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (ডিভিসি)-র ছাড়া জলে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ঘাটাল, আরামবাগ, হুগলি সহ একাধিক এলাকা জলে ডুবে যাওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছে মানুষ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিদর্শনে গিয়ে সরাসরি ডিভিসি-কে দায়ী করেন। তাঁর অভিযোগ, ডিভিসি ইচ্ছাকৃতভাবে জল ছেড়ে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
এই ঘটনার জেরে কেন্দ্র এবং রাজ্যের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের আবহ তৈরি হয়েছে।
তৃণমূলের অভিযোগ: তথ্য গোপন করছে মোদী সরকার
রাজ্যসভায় ডিভিসি-র জলছাড়ার বিষয়ে তথ্য জানতে চান তৃণমূল সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর চারটি প্রশ্নের জবাব দেওয়ার কথা ছিল কেন্দ্রের।
ঋতব্রতের প্রশ্নগুলো ছিল:
1. ১৮ জুন থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত কি ডিভিসি ২৭ হাজার লক্ষ কিউবিক মিটার জল পশ্চিমবঙ্গে ছেড়েছে?
2. জল ছাড়ার আগে কি রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছিল?
3. যদি আলোচনা হয়ে থাকে, তার বিস্তারিত তথ্য কী?
4. যদি আলোচনা না হয়, কেন তা করা হয়নি?
কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রক এই প্রশ্নের লিখিত জবাব দিয়েছে। কিন্তু সেই জবাবে স্পষ্ট করে আলোচনা হয়েছে কি না, তা উল্লেখ করা হয়নি।
কেন্দ্রের জবাব: নিয়ম মেনে বৈজ্ঞানিকভাবে কাজ করেছে ডিভিসি
জলশক্তি মন্ত্রক জানায়, ১৮ জুন থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত মাইথন এবং পাঞ্চেত জলাধার থেকে মোট ২৭,৯৮৭ লক্ষ কিউবিক মিটার জল ছাড়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সি আর পাতিল জানান, ডিভিসি ‘ডিভিআরআরসি’র নির্দেশ মেনে, বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে এবং পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ড সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করেছে।
কেন্দ্র দাবি করেছে, বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পানীয় জল, সেচ, নৌ-পরিবহন ও শিল্পক্ষেত্রের সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তৃণমূলের পাল্টা দাবি: ‘ম্যান মেড ডিজ়াস্টার’
কেন্দ্রের উত্তরে সন্তুষ্ট নয় তৃণমূল। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, “কৌশলে তথ্য গোপন করেছে বিজেপি সরকার।”
তিনি দাবি করেন:
জুন-জুলাই দুই মাসে ডিভিসি ৫০,২৮৭ লক্ষ কিউবিক মিটার জল ছেড়েছে।
২০২৩ সালের তুলনায় জল ছাড়ার পরিমাণ ৩০ গুণ বেশি।
২০২৪ সালের তুলনায় ১১ গুণ বেশি।
তাঁর বক্তব্য, “জল ছাড়ার তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের ফসল ধ্বংস, মানুষ গৃহহীন। এটা নিছক প্রাকৃতিক বন্যা নয়, এটা ‘ম্যান মেড ডিজ়াস্টার।’”
ডিভিসি কমিটি নিয়ে প্রশ্ন
কেন্দ্র জানিয়েছে, জলছাড়ার সিদ্ধান্ত ‘রিভার ম্যানেজমেন্ট কমিটি’-র নির্দেশ অনুযায়ী নেওয়া হয়, যেখানে ঝাড়খণ্ড এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিনিধিও থাকেন।
কিন্তু ঋতব্রতের বক্তব্য, “কমিটি থাকলেই কি আলোচনা হয়? কেন্দ্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কিছুই বলেনি।”
এই বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। তৃণমূলের অভিযোগ, বিজেপি ডিভিসি-কে দিয়ে জল ছেড়েছে বাংলাকে ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য।
ঋতব্রতের কটাক্ষ, “এই জলছাড়ার জন্য ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে বাংলার মানুষের জলের তোড়ে বিজেপির রাজনৈতিক সলিলসমাধি অনিবার্য।”

ডিভিসি-র জলছাড়ার ফলে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
ঘাটাল: ঘরবাড়ি প্লাবিত, ফসলের ক্ষতি।
আরামবাগ: বহু মানুষ গৃহহীন, ত্রাণ শিবিরে ভিড়।
হুগলি, বাঁকুড়া, পূর্ব মেদিনীপুর: নদীর জল বিপজ্জনক মাত্রায়।
কৃষি, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের জীবনে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।
ডিভিসি জলছাড়ার ঘটনায় কেন্দ্র-রাজ্যের দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে। কেন্দ্র দাবি করছে, বিজ্ঞানসম্মতভাবে কাজ করা হয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূলের অভিযোগ, এটা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।