কনিষ্ক সামন্ত। কলকাতা সারাদিন।
শনিবার রাতে মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা রোডে শুভেন্দু অধিকারীর কনভয়ে হামলার অভিযোগ ঘিরে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। ঘটনার জেরে প্রায় ছয় ঘণ্টা থানায় ধর্নায় বসেছিলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা। রাত গড়িয়ে সকাল হতেই এই ঘটনা নিয়ে তৎপর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। সূত্রের খবর, অমিত শাহের মন্ত্রক ইতিমধ্যেই এই ঘটনার রিপোর্ট তলব করেছে। অন্যদিকে, গোটা ঘটনাকে ‘সাজানো নাটক’ এবং ‘নিজেদের দলের কোন্দল’ বলে পালটা তোপ দেগেছে শাসকদল তৃণমূল।
পুরুলিয়ার সভা সেরে ফেরার পথে চন্দ্রকোনায় কনভয়ের উপর হামলার অভিযোগ ঘিরে রাজ্য-রাজনীতি উত্তাল। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ জানিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-কে ফোন করেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। দু’জনের মধ্যে প্রায় ১৫ মিনিট কথা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। হামলাটি ‘প্রাণঘাতী’ ছিল এবং পুলিশের সহযোগিতায় শাসকদলের যুব নেতৃত্ব ও কর্মীরাই এই ঘটনা ঘটিয়েছে-এমন অভিযোগই নাকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছেন শুভেন্দু।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ইতিমধ্যেই হামলার সময়ের ভিডিও ফুটেজ চেয়েছে।
সূত্রের খবর, এ বিষয়ে বিরোধী দলনেতার দফতরের কাছ থেকেও একটি রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে এবং সেই সঙ্গে ভিডিও ফুটেজ পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
এই অভিযোগকে ঘিরে রাজ্যজুড়ে শুরু হয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক টানাপোড়েন। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-কে যেদিন থেকে হারিয়েছেন, সেদিন থেকেই শুভেন্দু অধিকারীর উপর একের পর এক হামলা চলছে।’
হামলার অভিযোগের প্রতিবাদে রাতেই জেলায় জেলায় রাস্তায় নামে বিজেপি। বাঁকুড়ার লালবাজারে পথ অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান দলের কর্মী-সমর্থকরা। বাঁকুড়ার বিজেপি বিধায়ক নিলাদ্রী শেখর দানা-র নেতৃত্বে ৬০ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করা হয়। একই সঙ্গে পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি থানার সামনেও বিক্ষোভে সামিল হন বিজেপি কর্মীরা। পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনায় রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কনভয়ে হামলার অভিযোগ উঠল তৃণমূলের বিরুদ্ধে। শনিবার রাত প্রায় সাড়ে ৮টা নাগাদ ঘটনাটি ঘটেছে। বিজেপি নেতার দাবি, বাঁশ, লাঠি নিয়ে তাঁর গাড়ির উপর চড়়াও হয়েছেন একদল তৃণমূল কর্মী ও সমর্থক। এ সব প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে চললেও পুলিশ এগিয়ে আসেনি বলে দাবি। প্রতিবাদে চন্দ্রকোনা রোড পুলিশ ফাঁড়িতে ঢুকে অবস্থানে বসেছেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, যত ক্ষণ না অপরাধীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে, তত ক্ষণ সেখানেই বসে থাকবেন তিনি।
দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার সন্ধ্যায় পুরুলিয়া থেকে জনসভা সেরে ফিরছিলেন নন্দীগ্রামের বিধায়ক। শুভেন্দুকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিলেন বিজেপি কর্মীরা। পথে গড়বেতা থানার অন্তর্গত চন্দ্রকোনা রোড বাজারের কাছে হঠাৎ বিপত্তি বাধে। ঘড়িতে তখন রাত প্রায় সাড়ে ৮টা। অভিযোগ, বিজেপি নেতার কনভয় চৌরাস্তা পার হতে না হতেই তাঁদের পথ আটকে দাঁড়ান তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকেরা। লাঠি, বাঁশ দিয়ে শুভেন্দুর গাড়ির উপর আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ। দু’পক্ষে স্লোগান-পাল্টা স্লোগান চলতে থাকে। কিন্তু প্রকাশ্য রাস্তায় বেশ কিছু ক্ষণ ধরে ঝামেলা চললেও পুলিশের দেখা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ।
এর পরেই চন্দ্রকোনা পুলিশ ফাঁড়িতে ঢুকে পড়েন শুভেন্দু। সটান মেঝেতে বসে পড়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, যত ক্ষণ না অপরাধীদের গ্রেফতার করা হবে, তত ক্ষণ অবস্থান চালিয়ে যাবেন তিনি। শুভেন্দু বলেন, ‘যত ক্ষণ না আপনারা দোষীদের গ্রেফতার করছেন, তত ক্ষণ বসে থাকব। এখান থেকে উঠব না। এসপি-কে জানান। পদাধিকারীকে জানান যে আমরা বসে আছি।’ আপাতত মেঝেতে বসেই আইনজীবীকে ডেকে অভিযোগপত্র লেখানোর কাজ চলছে। তবে অভিযোগপত্র লেখানো নিয়ে পুলিশের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা। খবর পেয়ে চন্দ্রকোনা রোডের দিকে রওনা হয়েছে পুলিশ। আদতে কী ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আজকে এখানে করেছে, ভেবেছে মেরে দেব, গাড়ি পুড়িয়ে দেব, এ পালিয়ে যাবে। পালিয়ে যাওয়ার লোক নই। ক্ষুদিরাম, মাতঙ্গিনী হাজরার দেশের লোক।’
পাল্টা অভিযোগ দায়ের তৃণমূলের
পাল্টা শাসকদল তৃণমূল-এর মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী দাবি করেন, ‘শুভেন্দুর গাড়িতে কোনও হামলা হয়নি। জয় বাংলা স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল-সেই স্লোগানও সামলাতে পারেননি তিনি।’
এদিকে তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ সোশ্যাল মিডিয়ায় কটাক্ষ করে লেখেন, ‘চন্দ্রকোনায় ভুল করে বিজেপি কর্মীদেরই পেটানো হলে কেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী জবাব দাও।’ তৃণমূলের রাজ্য সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার এই ঘটনাকে ‘নাটক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দলের কাছে এই নিয়ে রিপোর্ট চাইবেন তাতে নতুনত্ব কী। তাঁর প্রশ্ন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক শুভেন্দু অধিকারীকে পর্যাপ্ত কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়েছে সুরক্ষার জন্য। 30-40 জন জওয়ান, বড় বড় বন্দুক নিয়ে তাঁকে ঘিরে থাকে। সেখানে 10-12 জন সাধারণ মানুষ বা তৃণমূল কর্মী এসে স্লোগান দিল, আর তারা ভয় পেয়ে গেল?’