সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
‘অবিভক্ত বাংলার রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদ। সেই মুর্শিদাবাদের মানুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে আজ নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হচ্ছে। এই নির্বাচন তৃণমূলকে জেতানোর নিবার্চন নয়। যারা বিজেপির বি-টিম হয়ে টাকা নিয়ে মাটিকে ভাগ করার চেষ্টা করেছে, মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে, তাদেরকে ঝেঁটিয়ে বের করার নির্বাচন।’ সোমবার মুর্শিদাবাদের জোড়া জনসভা থেকে এভাবেই এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলা এবং বাঙালির অস্মিতার রক্ষার জন্য ভোট দেওয়ার আহ্বান জানালেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
সোমবার জলঙ্গির সাদিখাঁরদিয়াড় বিদ্যানিকেতন গ্রাউন্ডে ডোমকল ও জলঙ্গি বিধানসভার প্রার্থী হুমায়ুন কবীর ও বাবর আলির সমর্থনে সভা করেন অভিষেক। সেখানেই তৃণমূলের নতুন দুই প্রতিপক্ষকে কটাক্ষ করে অভিষেক বলেন, ‘এই মুর্শিদাবাদ জেলায় বিজেপির তিনটে এজেন্সি কাজ করছে। একটা হলো নির্বাচন কমিশন। যার মাথায় রয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার। তিনি মানুষের নাম কাটার সঙ্গে যুক্ত। দ্বিতীয় এজেন্সি হলো কংগ্রেসের অধীররঞ্জন চৌধুরী। তৃতীয় এজেন্সি হুমায়ুন কবীর ও আসাউদ্দিন ওয়াইসির মিম আর ডিম। ওঁদের নাম নিলে সভার পরিবেশ খারাপ হয়।’
সামনেই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। তার আগে রণকৌশল স্থির করতে এবং দলীয় প্রার্থীর সমর্থনে মুর্শিদাবাদের জলঙ্গীতে এক বিশাল জনসভায় যোগ দিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার দিনের প্রথম এই সভা থেকে একদিকে যেমন তিনি বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ শানান, তেমনই গত পাঁচ বছরে রাজ্য সরকারের উন্নয়নের খতিয়ান বা ‘রিপোর্ট কার্ড’ তুলে ধরেন জনগণের সামনে।
জলঙ্গী বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী বাবর আলীর সমর্থনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অভিষেক বলেন, ‘আমাদের প্রার্থী অত্যন্ত স্বচ্ছ ভাবমূর্তির এবং নিবেদিতপ্রাণ।’ অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের মুস্তাফিজুর রহমান ও ইউনুস আলী সরকারকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন তিনি। অভিষেক দাবি করেন, যারা অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত এবং যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তাদের ভোট দিয়ে মূল্যবান ভোট নষ্ট করা উচিত নয়। স্বচ্ছ ভাবমূর্তির তরুণ নেতৃত্ব হিসেবে বাবর আলী ও হুমায়ুন কবিরকে বিপুল ব্যবধানে জয়ী করার ডাক দেন তিনি। তাঁর কথায়, সিপিআইএম প্রার্থী মুস্তাফিজুর রহমানকে তীব্র আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘মুস্তাফিজুর রহমান রানা বাবুকে দলের ভেতরেই তাঁর নেতারা মানছেন না। ২০২১ সালে প্রায় ৪৮ হাজার ভোটে এখান থেকে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন। যে দল একজন প্রার্থীর সমর্থনে নিজেদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখতে পারে না, সেই দলকে ভোট দিয়ে ভোট নষ্ট করবেন না। জলঙ্গীতে আমাদের প্রার্থী ভ্রাতৃপ্রতিম বাবর আলী। ১৯৯৩ সালে তাঁর জন্ম। মাত্র ন’বছর বয়স থেকে তিনি শিশুদের পড়ানো শুরু করেছেন এবং টিউশন ফি-মুক্ত স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি এক অনন্য নিদর্শন স্থাপন করেছেন। বেলডাঙা থেকে শুরু করে মুর্শিদাবাদসহ বাংলার একাধিক জায়গায় তিনি নিঃস্বার্থভাবে মানুষের জন্য শিক্ষার প্রসারে ও প্রগতির স্বার্থে কাজ করেছেন।’

এছাড়াও উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরে অভিষেক বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার কতজন মহিলাকে লক্ষ্মীর ভান্ডার ও স্বাস্থ্যসাথী দিয়েছে, তার পরিসংখ্যানও আমি এনেছি। ডোমকল বিধানসভায় ১ লক্ষ ১ হাজারের বেশি মহিলা প্রতি মাসে লক্ষ্মীর ভান্ডার পাচ্ছেন এবং জলঙ্গী বিধানসভায় ৯৪,৫৭২ জন মহিলা এটি পাচ্ছেন। খাদ্যসাথী প্রকল্পে ডোমকলে ৩ লক্ষ ৭০ হাজার এবং জলঙ্গীতে ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার মানুষ বিনামূল্যে রেশন পাচ্ছেন। ডোমকল ও জলঙ্গী মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার যুবক-যুবতী ‘যুবশ্রী’ প্রকল্পে মাসে ১৫০০ টাকা করে পাচ্ছেন। কন্যাশ্রীতে ডোমকলে ৪৪ হাজার এবং জলঙ্গীতে ৩১ হাজার বোন উপকৃত হয়েছেন। পথশ্রী প্রকল্পে ডোমকলে ৭৬টি রাস্তার জন্য প্রায় ৫০ কোটি এবং জলঙ্গীতে ১১৯টি রাস্তার জন্য ৫১ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জলঙ্গীর ক্ষেত্রেও জলঙ্গী দক্ষিণ ব্লকে দিয়ার হাসপাতাল সংস্কার ও আধুনিকীকরণ করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ সালে সাদিখার দিয়ার স্কুল মোড় থেকে খয়রামারি সাতনেগড় পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার রাস্তার কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। সাজিমারি জিপিতে রসুননগর হাই স্কুল মাদ্রাসার ছাত্রীদের নিরাপদ আবাসের জন্য প্রায় ১.৫ কোটি টাকা খরচ করে একটি ৫০ শয্যাবিশিষ্ট গার্লস হোস্টেল তৈরি করেছে আমাদের সরকার। চুয়া পাড়া বিদ্যানিকেতন স্কুলে ২ কোটি টাকা খরচ করে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি ছাত্রাবাস নির্মাণাধীন রয়েছে। ‘আমার পাড়া আমার সমাধান’ প্রকল্পে এই জলঙ্গী বিধানসভায় প্রায় ২৭ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে।’ এদিন জলঙ্গীর মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে এলাকায় একটি ফায়ার ব্রিগেড এবং দুধের চিলিং প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
সিপিএমকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘সিপিএমের যদি ক্ষমতা থাকে, তবে তারা দেখাক- ৩৪ বছরে তারা ডোমকল বা জলঙ্গীতে ক’টা রাস্তা করেছিল বা ক’টা গ্রামে বিদ্যুৎ ও সাবমার্সিবল দিয়েছিল? আপনারা তথ্য ও পরিসংখ্যান নিয়ে লড়াই করতে আসুন। একদিকে থাকবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের উন্নয়ন, আর অন্যদিকে থাকবে সিপিএম-কংগ্রেসের ব্যর্থতা। যদি তারা সঠিক তথ্য দিতে পারে, তবে আমি ভোট চাইতে আসব না। এদের ১০ শূন্য গোলে হারিয়ে মাঠের বাইরে বের করব।’ বিজেপিকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে অভিষেক বলেন, ‘যারা আপনাদের ১০০ দিনের কাজের টাকা, আবাসের টাকা আটকে রেখেছে, তাদের উচিত শিক্ষা দেওয়ার সময় এসেছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যে মানুষের অধিকার নেই, একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আপনাদের জন্য সুপ্রিম কোর্টে লড়াই করছেন।’ সিপিএম ও কংগ্রেসকে ‘বিজেপির বি-টিম’ ও ‘দালাল’ আখ্যা দিয়ে তিনি ভোটারদের সতর্ক করেন।