রঞ্জন মাহাতো। কলকাতা সারাদিন।
গায়ের জোরে ভয় দেখিয়ে যদি অত্যাচার করেন, তাহলে আমাদের দেহ পেরিয়ে যেতে হবে। আমরা দাঁড়িয়ে থাকব পাহারাদার হিসেবে। এনআরসি মানছি না। মানবো না। সম্প্রতি দিল্লি সহ ভারতের একের পর এক ভারতীয় জনতা পার্টি শাসিত রাজ্যে বাংলায় কথা বলা বাঙালিদের উপরে অত্যাচারের পাশাপাশি ভাজপা যেভাবে নির্বাচন কমিশন কে কাজে লাগিয়ে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দিতে চাইছে তার বিরুদ্ধে ঝাড়গ্রামের ঐতিহাসিক পদযাত্রা থেকে হুংকার দিলেন মমতা। ভারতীয় জনতা পার্টির উদ্দেশ্যে খোলা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে মমতা বলেন, ওরা জানে আমি ভাঙি তবু মচকাই না। ওরা আমায় জব্দ করতে চাইলে, মানুষ ওদের স্তব্ধ করে দেবে। আমাকে শান্তিতে থাকতে দিন। আমি শান্তিতে থাকলে শান্ত হয়ে যাই। আমার বিরুদ্ধে বজ্জাতি করলে, আমি টর্নেডো হয়ে যাই। আমি সুনামি হয়ে যাই। তখন আমাকে রোখা খুব মুশকিল। জ্যান্ত বাঘের চেয়ে আহত বাঘ খুব ভয়ঙ্কর। আমাদের আহত করার চেষ্টা করবেন না।
ভাজপা শাসিত কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে জাতীয় নির্বাচন কমিশন যেভাবে ভোটার তালিকার এসআইআর বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনী চালু করতে চাইছে তার বিরুদ্ধে ফের হুঙ্কার দিলেন মমতা। বাংলার বিভিন্ন জেলায় জেলায় মমতার নেতৃত্বে শুরু হয়েছে ভাষা আন্দোলন। আজ ঝাড়গ্রামের মঞ্চ থেকে চরম বার্তা দিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। এসআইআর প্রক্রিয়ায় নাম বাদ দিতে হলে তাঁর দেহ পেরিয়ে যেতে হবে বলে সাবধান করলেন তিনি। আজ প্রথমে পুরাতন ঝাড়গ্রাম থেকে পাঁচমাথা মোড় পর্যন্ত ভাষা আন্দোলন উপলক্ষে আয়োজিত মিছিলের নেতৃত্ব দেন মুখ্যমন্ত্রী। মিছিলে মমতার সঙ্গে পা মেলান ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, বীরবাহা হাঁসদা-সহ তৃণমূলের সর্বস্তরের নেতা-নেত্রী এবং জেলার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা। মিছিল শেষে পাঁচমাথা মোড়ে পথসভা করেন তিনি। সেই সভা থেকেই বাংলা ভাষার স্বার্থে ভারতীয় জনতা পার্টির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করেন মমতা।
বাংলাভাষীদের হেনস্থা ইস্যুতে
আজ বাংলা ভাষায় কথা বললে জেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশি বলা হচ্ছে। রোহিঙ্গা বলছে।
ওরা বলছে বাংলা বলে কোনও ভাষা নেই! আমি বলি, হ্যাঁ, বাংলা নেই, তাহলে তোমাদের মতো শয়তানদের ভাষা আছে নাকি?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিবেকানন্দ থেকে বাংলার মনীষীরা কোন ভাষায় কথা বলতেন?
আজ যদি স্বামীজি বেঁচে থাকতেন, বলতেন, এই দেশ আমি চাইনি।
স্বাধীনতা আন্দোলনের, নবজারণ শুরু করেছিল বাংলা। বাংলা ছাড়া ভারতবর্ষ হয় না। পৃথিবী হয় না।
যদি প্রকৃত বাঙালিদের নাম কাটা হয়, তাহলে আমি গোটা বিশ্ব ঘুরে ওদের মুখোশ টেনে খুলে দেব।
আমি কখনও দেশের বিরুদ্ধে বাইরের দেশে কিছু বলি না। কিন্তু যদি বাংলার উপর অত্যাচার চলে, তাহলে আমি আর চুপ থাকব না।
আমি গোটা বিশ্বকে জানিয়ে দেব— এই সরকার আমাদের মানুষের উপর কী ভয়াবহ অত্যাচার চালাচ্ছে।
একজন মালপোয়া আছে— সে বলছে বাংলা ভাষার পক্ষে কথা বলার জন্য ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে গ্রেফতার করা উচিত আমাকে! সাহস থাকলে বলো, কবে গ্রেফতার করবে, কবে গুলি করবে?
কেউ ফোন করলেই ফোন তুলে বলবেন, জয় বাংলা, বলুন। রিংটোন, কলারটিউনে সব জয় বাংলা করে নেবেন।
যেসব গুজরাতি লোকেরা আমেরিকায় ছিলেন, ট্রাম্প তাদের হাত বেঁধে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। লজ্জা করে না?
আমি যেদিন নিজে মনে করব, সেদিনই হঠাতে পারবেন আমাকে।
তীব্র আক্রমণ নির্বাচন কমিশনকে
নির্বাচন কমিশন অমিত শাহের হাতের পুতুল। যে দিকে নাচাবেন, সে দিকেই নাচবে।
২ মাসের জন্য নির্বাচনে আসেন। আবার উড়ে চলে যান। বসন্তের কোকিলের মতো। এখন নির্বাচনের অনেক দেরি রয়েছে। এখন থেকে সাসপেন্ড করতে শুরু করেছেন। হরিদাস সব, ক্রীতদাস সব।
সরকারি দফতরের নাম করে ভয় দেখানো হচ্ছে। আমার দু’জন অফিসারকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সাসপেন্ড করা হল।
কোন আইনে বলে তুমি নোটিশ পাঠিয়ে দিচ্ছ। অফিসারদের ভয় দেখাচ্ছে, পুলিসকে ভয় দেখাচ্ছ। কালকেও ইআরও-দের সাসপেন্ড করে দিয়েছে।
এখনও নির্বাচন শুরু হয়েছে? আট মাস বাকি।
কোন আইনের মাধ্যমে সাসপেন্ড করছেন? অমিত শাহের দালালি করছেন?
কোন আইনের বলে তুমি নোটিস পাঠাচ্ছ? সাসপেন্ড করছ। আর বলে দিচ্ছ, এফআইআর করতে হবে। হবে না। আমি কারও পানিশমেন্ট হতে দেব না। এটা মাথায় রাখবেন।
লজ্জা করে না? তুমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দালালি করছ। অমিত শাহ তো মনে করেন, উনি যা বলবেন, তাই হবে। বাবাসাহেব আম্বেদকরের কথা শোনেন না।
ইলেকশনের অনেক দেরি আছে। এখন সাসপেন্ড করতে শুরু করেছে।
বিজেপির বন্ডেড লেবার। তুমি তোমার ক্ষমতা জানো না। অমিত শাহের দালালি করছ চেয়ারে বসে।
অমিত শাহ আগে জন্মের শংসাপত্র দেখান।
বাংলার সরকারি অফিসারদের বলব নিশ্চিন্তে থাকবেন। আমরা আপনাদের জীবন দিয়ে রক্ষা করব।
তীব্র আক্রমণ সিপিএমকে
আজ কেশপুরের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় সাধারণ মানুষের বিপুল ভিড় দেখে দাঁড়িয়ে যান মমতা। সিপিএম আমলের অত্যাচারের অন্যতম প্রতীক কেশপুরে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন,
কেশপুরে অত্যাচার চলত সিপিআইএম-এর। এই কেশপুরই সিপিআইএম-এর শেষপুর হয়েছিল।
এখন রং বদলে বিজেপি সেই অত্যাচারী সিপিআইএম-এর স্থান নিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনকে করেছে তাদের দোসর। এই কেশপুর হবে বিজেপির-ও শেষপুর।
সিপিএম পর্যন্ত গুলি চালিয়েছে আমার উপর। তাদের নির্যাতন সহ্য করেছি— তাহলে এসব লোকেদের আমি পিঁপড়ের মতো তাড়িয়ে দেব।
আমি যেদিন নিজে মনে করব, সেদিন হঠাতে পারবেন। আমি যেদিন নিজে মনে করব না, সেদিন আপনার লোকেরাও আমাকে ভোট দেবেন। কারণ, তাঁদেরও আশ্রয় চাই। তাঁদেরও ঠিকানা চাই। এটা মাথায় রাখবেন।
একসময় মানুষ ঝাড়গ্রামে আসতেন স্বাস্থ্য উদ্ধার করতে।
কিন্তু বাম আমলে মানুষ গোয়ালতোড়, বেলপাহাড়ি, ঝাড়গ্রামে মানুষ আসতে ভয় পেতেন। আমি কিন্তু, আসতাম।
আমার দল ক্ষমতায় আসার পরই আমি প্রথম এখানে আসি। কারণ আমি চেয়েছিলাম ঝাড়গ্রামে শান্তি ফিরে আসুক।

এনআরসি মানছি না, মানব না
এসআইআরের নেপথ্যে এনআরসি। ভয়ে মানুষ আত্মহত্যা করছে। কিন্তু কেউ ভয় পাবেন না। মানুষের অধিকার কাড়তে দেব না।
এনআরসি মানছি না, মানব না।
আজকে জাগার পালা। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ করার পালা। আমরা বলব না, আমাদেরই ভোট দিন। কিন্তু, আমরা প্রতিবাদ না করলে অসমের মতো ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করবে।
অসমে ৭ লক্ষ বাঙালিকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। হিন্দু বাঙালিও ছিল। সংখ্যালঘুকে বাদ দিয়েছে।
রাজবংশী, তফশিলি সম্প্রদায় কোচবিহার নোটিশ পাঠাচ্ছেন। আলিপুরদুয়ার তফশিলি শীল পরিবারের নোটিশ পাঠাচ্ছেন।
মধ্যপ্রদেশে একটি আদিবাসী মেয়ে, তার বাড়ির বাংলায়। বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। লজ্জা করে না, ছিঃ ছিঃ ছিঃ।
কী বলছে এ বার? নতুন করে ভোটার তালিকায় নাম তুলতে হবে। মনে রাখবেন অসমে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দিয়েছিল।
বিজেপি পার্টি লিস্ট তৈরি করবে? আপনার ঠিকানা আপনাকে ঠিক করতে হবে। একটাও যেন ভোটারের নাম বাদ না যায়।
নাম বাদ দিতে হলে আমার দেহ পেরিয়ে যেতে হবে, এনআরসি মানছি না, মানব না।
আজ এই মিটিং থেকে আওয়াজ উঠুক। রক্ত দেব। কলিজা দেব। কিন্তু বিনা যুদ্ধে এক ইঞ্চি জমি ছাড়ব না।
আমাদের শপথ, এনআরসি করতে দিচ্ছি না, দেব না। অসম থেকে বাংলায় নোটিস পাঠাচ্ছ। সাহস তো কম নয়।
নোটিস পাঠালে কেউ যাবেন না। গেলেই জেলে পুরে দেবে। আমরা আইনজীবী দিয়ে লড়ে নেব।
ওটা বেআইনি। গণন্ত্রণ বিরোধী, অসংবিধানিক। অসম সরকার এই নোটিস পাঠাতে পারে না। ধিক্কার জানাই।
ধিক্কার ধিক্কার বিজেপি সরকারকে ধিক্কার, অসম সরকারকে ধিক্কার। আমরা সবাই ভোটার।
হঠাত্ করে বিজেপি ঠিক করল কী করে জিতব! নাম বাদ দাও। কী বলছে, নতুন করে সবাইকে নাম তুলতে হবে, কেন?
এটা বিজেপি চালাকি, এর পিছনে এনআরসি-র চক্রান্ত আছে।