বাংলার ইতিহাসে স্বাধীনতার প্রাক্কালে ঘটে যাওয়া অন্যতম ভয়াবহ অধ্যায় হল ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা। সেই প্রেক্ষিতেই উঠে আসে বাঙালির এক ঐতিহাসিক চরিত্র গোপাল মুখোপাধ্যায়, যিনি মুখে মুখে পরিচিত ছিলেন ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে। সম্প্রতি মুক্তির অপেক্ষায় থাকা একটি হিন্দি ছবিতে তাঁর চরিত্র বিকৃতভাবে দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। সেই কারণেই পরিবারের পক্ষ থেকে পরিচালকের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। এই বিতর্ক এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে। বিষয়টি পরিচিত হয়েছে Gopal Patha controversy 2025 নামে।
অভিযোগের সূচনা
গোপাল মুখোপাধ্যায়ের নাতি শান্তনু মুখোপাধ্যায় বউবাজার থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরিবারকে বিন্দুমাত্র অনুমতি না নিয়ে ছবিতে তাঁর দাদুর চরিত্র ব্যবহার করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ছবির ট্রেলার ও গল্পে তাঁকে পরিচয় করানো হয়েছে “এক থা কষাই গোপাল পাঁঠা” নামে।
শান্তনুর অভিযোগ, “দাদুর চরিত্র সিনেমায় রাখা হবে বলে আমাদের কোনও অনুমতিই নেওয়া হয়নি। উল্টে ট্রেলারে বা সিনেমার গল্পে তাঁকে ‘এক থা কষাই গোপাল পাঁঠা’ বলে পরিচয় করানো হচ্ছে।”
এই ঘটনার প্রতিবাদে পরিচালকের কাছে আইনি নোটিসও পাঠানো হয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ‘গ্রেটার ক্যালকাটা কিলিং’-এর ভয়াবহ ঘটনার ৮০ বছর পূর্ণ হলো এ বছর। বউবাজারের মলঙ্গা লেন, ওয়েলিংটন স্কোয়ার সংলগ্ন এলাকায় সেই সংঘর্ষের সূত্রপাত। স্বাধীনতার প্রাক্কালে বাংলার মানচিত্র অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য গোপাল মুখোপাধ্যায় অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন।
শান্তনুর মতে, “দাদু আমার কষাই চরিত্র ছিলেন না, ভিলেনও ছিলেন না। ছিলেন সিংহহৃদয়। ১৯৪৬-এ মুসলিম লিগের দাঙ্গা প্রতিরোধে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে আতঙ্কিত মানুষের স্বার্থে যিনি অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। বাঁচিয়েছিলেন এই বাংলা ও বাঙালিকে।”
গোপালের আসল পরিচয়
ইতিহাস অনুযায়ী, গোপাল মুখোপাধ্যায় অনুশীলন সমিতির সক্রিয় কর্মী ছিলেন। পাশাপাশি তাঁর পেশা ছিল দুটি মাংসের দোকান চালানো। কুস্তিগির হিসেবেও তিনি সমাদৃত ছিলেন। হিন্দিভাষীরা তাঁর বুকের পাট্টা দেখে তাঁকে ডাকতে শুরু করেন ‘পাট্টা’, আর সেই নামের সঙ্গে পেশার মিলিয়ে প্রচলিত হয় ‘গোপাল পাঁঠা’।
কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় কেবল পেশায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন সাহসী, সিংহহৃদয় বাঙালি, যিনি দাঙ্গার সময় সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে নিজের জীবন বিপন্ন করেছিলেন।
দাঙ্গার দিনগুলিতে ভূমিকা
১৯৪৬ সালের দাঙ্গার সময় গোপাল মুখোপাধ্যায় তাঁর অনুগামীদের অস্ত্র হাতে রুখে দাঁড়াতে বলেন। তাঁর বিখ্যাত নির্দেশ ছিল—
“লিগ দাঙ্গাকারীরা একজনকে মারলে, ১০ জনকে মারবে। কিন্তু নিরীহ কোনও বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বা মহিলা মুসলিমদের কেশ ছোঁয়া যাবে না।”
এই নির্দেশই প্রমাণ করে তিনি কেবল প্রতিরোধে বিশ্বাসী ছিলেন, নিরীহ সাধারণ মানুষকে আঘাত করা তাঁর নীতির মধ্যে ছিল না।
বিতর্কিত চলচ্চিত্র
পরিবারের অভিযোগ, পরিচালক বিবেক আগ্রহী হয়েছেন কেবল মাত্র চমক তৈরি করতে। ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে বিকৃত করে গোপাল মুখোপাধ্যায়কে ‘কষাই’ বা ‘ভিলেন’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে। পরিবারের মতে, এর ফলে শুধু এক ব্যক্তির চরিত্রই নয়, বাংলার ইতিহাসের গৌরবজনক অধ্যায়ও কলুষিত হবে।
শান্তনু প্রশ্ন তুলেছেন, দাদুর জীবন ও সংগ্রামকে কাল্পনিক আখ্যান দিয়ে উপহাস করার অধিকার কোনও পরিচালক বা প্রযোজকের নেই।
পরিবার ও সমাজের প্রতিক্রিয়া
বাঙালি সমাজের একাংশও এই ঘটনার বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। অনেক ইতিহাসবিদ ও গবেষক মনে করছেন, যাঁরা স্বাধীনতার প্রাক্কালে দাঙ্গা প্রতিরোধে লড়েছিলেন, তাঁদের চরিত্র বিকৃত করা মানে সেই সময়ের সংগ্রামকে অস্বীকার করা।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, কেবল শিল্পীস্বাধীনতার নামে কতদূর পর্যন্ত ইতিহাস বিকৃত করা যায়?
Gopal Patha controversy 2025 শুধু একটি সিনেমাকে ঘিরে নয়, বরং ইতিহাস বনাম বিনোদনের দ্বন্দ্বকেও সামনে এনেছে। পরিবারের দাবি, গোপাল মুখোপাধ্যায় ছিলেন বাংলার রক্ষক, ভিলেন নয়। ইতিহাসের সেই যোদ্ধার পরিচয় বিকৃত করে দেখানো হলে তা শুধু একটি পরিবারকেই নয়, সমগ্র বাংলার আবেগকেই আঘাত করবে। আদালত ও সমাজের রায়ের অপেক্ষায় আজ গোটা দেশ তাকিয়ে আছে।