সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘বাংলা আমার দ্বিতীয় বাড়ি, ভবিষ্যতেও এই রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকব।’ এভাবেই বাংলার রাজ্যপাল পথ থেকে রহস্যজনকভাবে অপসারিত হওয়ার পরে বাংলা ছাড়ার আগে বাংলার মানুষের উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি দিলেন প্রাক্তন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস। একইসঙ্গে তিনি বাংলার মানুষকে তাঁর খোলা চিঠিতে জানিয়েছেন রাজভবনের দায়িত্ব শেষ হলেও পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ নয়।
গতকাল অর্থাৎ মঙ্গলবার রাতেই কথা হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। প্রসঙ্গত, দিল্লিতে গিয়ে ইস্তফা দেওয়ার পর কলকাতায় ফিরে আর রাজভবন-মুখো হননি সিভি আনন্দ বোস৷ আলিপুরে রাজ্য সরকারের অতিথিশালায় রয়েছেন তিনি৷ মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য দাবি করেছেন, প্রাক্তন রাজ্যপাল নিজে হোটেলে থাকতে চেয়েছিলেন৷ কিন্তু তিনিই তাঁকে রাজ্য সরকারের অতিথিশালায় থাকার জন্য অনুরোধ করেন৷ মঙ্গলবার ধর্না প্রত্যাহারের পরই ধর্মতলা থেকে সরাসরি সিভি আনন্দ বোসের সঙ্গে দেখা করতে যান মুখ্যমন্ত্রী৷ তিনি যে রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন তা আগে জানিয়েও দেন মুখ্যমন্ত্রী৷ প্রাক্তন রাজ্যপালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বেরনোর পর তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে ফের সরব হন মুখ্যমন্ত্রী৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বাংলার শিষ্টাচার মেনে দেখা করতে এসেছি৷ ওঁর সঙ্গে অবিচার হয়েছে৷ পাঁচ বছরের মেয়াদ ছিল৷ দেড় বছর আগেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে নির্বাচনের আগে ওঁকে সরিয়ে দেওয়া হল৷ ওঁকে আমার মনের কথা আমি বলে এসেছি৷ ওঁর সেদিন বাগডোগরা যাওয়ার কথা ছিল৷ তার আগে দিল্লিতে ডেকে নেওয়া হল৷ উনি আগামিকাল চলে যাচ্ছেন। ওনার সঙ্গে অনেক দিন কাজ করেছি। আমার সঙ্গে সম্পর্ক ভাল। ওনার পরিবারের সঙ্গেও সম্পর্ক ভাল।’
এবার বাংলা ছাড়ার আগে বাংলার মানুষের উদ্দেশ্যে খোলা চিঠিতে গত তিন বছরে বাংলার মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ভালবাসা ও সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন প্রাক্তন রাজ্যপাল ড. সিভি আনন্দ বোস। খোলা চিঠিতে মহাত্মা গান্ধি ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্ধৃতি উল্লেখ করেন সিভি আনন্দ বোস গত তিন বছরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের সঙ্গে দেখা ও কথা বলার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। প্রাক্তন রাজ্যপাল বাঙালির আবেগের কথা মনে রেখেই তাঁর চিঠিতে তাঁর প্রার্থনার কথাও জানিয়ে লিখেছেন, ‘মা দুর্গা যেন বাংলার মানুষকে রক্ষা করেন।’ চিঠিতে তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বিখ্যাত উক্তিও তুলে ধরেন। যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার চরণে ঈশ্বরকে খোঁজার যে বার্তা ছিল, তার উল্লেখ করে বলেন যে, তিনি কলকাতার অলিগলি এবং গ্রামের মেঠো পথে সাধারণ মানুষের চোখের মধ্যেই ঈশ্বরকে খুঁজে পেয়েছেন। তিন বছরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ এবং মানুষের সাথে আলাপচারিতার সুযোগ পেয়েছি। আমি তাদের খড়ের কুঁড়েঘরে মানুষের সাথে খাবার ভাগাভাগি করেছি। আমি তরুণ পণ্ডিতদের সাথে পড়াশোনা করেছি। আমাদের ভাইদের সামাজিক ব্যবস্থায় যে গর্ব রয়েছে তা বাংলার মানসিকতার কথা বলে।
অন্যদিকে, তাঁর প্রতি ‘অবিচার’ হয়েছে, মেয়াদ শেষের আগে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে যে দাবি করেছেন মমতা, তা নিয়ে প্রতিক্রিয়া চাওয়া হয়। জবাবে বোস বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রীর কাছে কী খবর আছে, তা আমি জানি না। তবে তিনি যখন কোনও মন্তব্য করেছেন, তার পিছনে নিশ্চয়ই কিছু কারণ আছে। আমি শুনেছি। কিছু বলার নেই।’ গতকাল মমতার সঙ্গে সাক্ষাতে কী কথা হয়েছে, জানতে চাইলে বোস বলেন, ‘উনি আসতেন, দেখা করতেন। সৌজন্যমূলক এবং পেশাদার সম্পর্ক ছিল আমাদের। আমি চলে যাচ্ছি বলে, বাংলার শিষ্টাচার মেনে উনি আমার সঙ্গে দেখা করার কথা ভেবেছিলেন, বিদায় জানাতে এসেছিলেন।’ পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল থাকাকালীন মমতা সরকারের সঙ্গে বার বার সংঘাত বাঁধে বোসের। কিন্তু লোকভবনের পরিবর্তে বর্তমানে রাজ্য সরকারের গেস্ট অফিসেই রয়েছেন তিনি। সেই নিয়ে প্রশ্ন করলে বলেন, ‘টক-মিষ্টি সম্পর্ক মিষ্টত্ব পেয়েছে।’ পশ্চিমবঙ্গের ভোটার হিসেবে রাজ্যে ভোটও দেবেন বলে জানিয়েছেন বোস।
রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বোসের মতবিরোধ দেখা দেয় বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। সেই নিয়ে প্রশ্ন করলে বলেন, ‘বিরোধী দলনেতার সঙ্গে ভাল সম্পর্ক ছিল আমার।’ কিন্তু হঠাৎ পদত্যাগের সিদ্ধান্ত কেন? বোস বলেন, ‘খেলার নিয়মই এটা, থামতে জানতে হয়। আমি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে ৪০ মাস কাজ করেছি। এমন পরিস্থিতি এল, যেখানে বিবেকের কাছ থেকে জবাব এল, পদত্যাগের সময় এসেছে। বিদায় জানানোর শেষ এসেছে। রাজ্যপাল হিসেবে আমি সবসময় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলাম। রাজনৈতিক চাপ কোনও প্রভাব ফেলেনি আমার উপর। আমার মনে হয়েছিল বিদায় জানানোর সময় এসেছে।’