সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
২০২০ সালের ১১ই জুলাই ভোর। গোটা দেশ তখন করোনার ভয়াবহ আতঙ্কে স্তব্ধ। কিন্তু সেই নিস্তব্ধ সকালেই সোনারপুরে ঘটে গেল এক রোমহর্ষক ঘটনা।
বাড়ির দরজা খোলা দেখে প্রতিবেশী অসীম দাস ভেতরে প্রবেশ করেন। মুহূর্তেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক দুঃস্বপ্নের দৃশ্য—রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে রয়েছেন গৃহকর্তা বাসুদেব গাঙ্গুলী এবং তাঁর বিবাহিতা কন্যা সুমিতা।
দেহজুড়ে একাধিক আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট। এই মর্মান্তিক ঘটনা মুহূর্তেই আলোড়ন তোলে সমগ্র এলাকায়।
সন্দেহভাজন থেকে অভিযুক্ত
প্রথম থেকেই সন্দেহের তীর গিয়ে লাগে বাড়ির আরও দুই সদস্যের দিকে—সুমিতার স্বামী রমেশ পন্ডিত ও শাশুড়ি অঞ্জলি পন্ডিত। ঘটনার পরই সোনারপুর থানায় দ্রুত মামলা রুজু হয় এবং তদন্তভার গ্রহণ করেন তৎকালীন এস.আই. প্রদীপ রায় (বর্তমানে ওসি, বকুলতলা থানা)। সুচারু তদন্তের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হন দুই অভিযুক্ত। পরে তদন্ত শেষ হলে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়।

আদালতে দীর্ঘ বিচারপর্ব
বারুইপুর ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে মাননীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ কৃষ্ণেন্দু হালদারের এজলাসে শুরু হয় বিচার। সরকারি পক্ষের আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব নেন অ্যাডভোকেট রথীন্দ্রনাথ নস্কর। আদালতে একে একে উঠে আসে একের পর এক সাক্ষ্য-প্রমাণ। বিচার চলাকালীন মৃত্যু হয় অভিযুক্ত অঞ্জলি পন্ডিতের, ফলে মামলার মূল দায়ভার এসে পড়ে রমেশ পন্ডিতের উপর।
রায় ঘোষণা
অবশেষে দীর্ঘ পাঁচ বছরের বিচার প্রক্রিয়ার পর, ২০২৫ সালের ৩০শে আগস্ট, আদালত ঘোষণা করে রায়। অপরাধী সাব্যস্ত হন রমেশ পন্ডিত। তাঁকে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন বিচারক। অর্থাৎ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁকে জেলের মধ্যেই কাটাতে হবে।
পুলিশের তৎপরতা ও কৃতজ্ঞতা
বারুইপুর জেলা পুলিশ এই রায় ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছে তদন্তকারী অফিসার এস.আই. প্রদীপ রায়কে, যিনি নিখুঁত তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করেন। পাশাপাশি প্রশংসা জানানো হয়েছে এস.আই. জয়ন্ত দাস (ওসি, ট্রায়াল মনিটরিং সেল) এবং তদন্ত ও বিচারপর্বে নিরলসভাবে যুক্ত সকল পুলিশকর্মীকে।
জনমনে সাড়া
এই জোড়া-হত্যাকাণ্ড কেবলমাত্র সোনারপুর নয়, সমগ্র দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাতেই আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। সেই থেকে এলাকার মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন আদালতের চূড়ান্ত রায়ের জন্য। অবশেষে আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায়ে অনেকের মনে হয়েছে ন্যায় প্রতিষ্ঠা হয়েছে। তবে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ক্ষত পরিবার ও প্রতিবেশীদের মনে আজও গভীরভাবে দাগ কেটে রেখেছে।
মামলাটি Sonarpur Double Murder Case নামে পরিচিত। তদন্তের প্রতিটি ধাপে পুলিশ আধিকারিকরা সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং সাক্ষীদের বয়ান সংগ্রহ করেছিলেন।
২০২১ সালে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রথম চার্জশিট দাখিল হয়।
রায় ঘোষণার দিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন নিহত পরিবারের আত্মীয়স্বজনরা।