সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
বিশ্বকাপ জয়ী বাংলার সোনার মেয়ে রিচা ঘোষকে জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে বরণ করে নিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। হাতে তুলে দিলেন সোনার ব্যাট এবং রাজ্য পুলিশের ডিএসপি পদে চাকরির নিয়োগ পত্র। সেই সঙ্গে রীতিমতো সারপ্রাইজ দিয়ে বাংলার প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী ক্রিকেটারকে ভূষিত করলেন বঙ্গভূষণ সম্মানে। সিএবির তরফে তাঁকে ৩৪ লক্ষ টাকা এবং সোনার ব্যাটও উপহার দেওয়া হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত মহিলা বিশ্বকাপ ক্রিকেট ফাইনালের ম্যাচে রিচা ঘোষকে সংবর্ধনায় সোনার চেন, ৩৪ রানের জন্য ৩৪ লক্ষ টাকা দিয়ে সম্মানিত করল রাজ্য সরকার। বিশ্বকাপ জয়ী খেলোয়াড় রিচার হাতে তুলে দেওয়া হল ডিএসপি- অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। প্রসঙ্গত, বিশ্বকাপে সব চেয়ে বেশি ছক্কা এসেছে রিচার ব্যাট থেকে। মোট ১২টি ছক্কা হাঁকিয়েছেন তিনি। সেমিফাইনাল ও ফাইনালে দ্রুত রান করে দলকে ভাল জায়গায় পৌঁছে দিয়েছেন।
সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় বাংলার ক্রিকেটকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করলেও বাংলা থেকে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ীর শিরোপা পেয়েছেন শিলিগুড়ির মেয়ে রিচা ঘোষ। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই তাকে সম্বর্ধনা দেওয়ার জন্য কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে বসলো রীতিমতো চাঁদের হাট। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি এই এদিনের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, প্রতিমন্ত্রী মনোজ তিওয়ারি, সিএবি সভাপতি তথা প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, ঝুলন গোস্বামী-সহ একাধিক প্রাক্তন ক্রিকেটার, সিএবির অন্য পদাধিকারী। সিএবির তরফে রিচাকে প্রথমে উত্তরীয় তুলে দেওয়া হয়, তারপর ফুল-মিষ্টি। সোনার মেয়েকে শুভেচ্ছা জানাতে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় সোনার ব্যাট ও বল। যা তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আসল সারপ্রাইজ অবশ্য বাকি ছিল। এবার রাজ্য সরকারের তরফে রিচাকে রাজ্যের অন্যতম সেরা নাগরিক সম্মান বঙ্গভূষণ তুলে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই সঙ্গে উত্তরীয় ও সোনার চেন। সেই সঙ্গে তাঁকে রাজ্য পুলিশে সাম্মানিক ডিএসপি পদও দেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সিএবির পক্ষ থেকে এদিন সম্মান জানানো হল ফ্রিডম ট্রফির রেপ্লিকা দিয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতের মধ্যে ২০১৫ থেকে থেকে এই ফ্রিডম ট্রফি চালু হয়েছে। এতে একদিকে থাকে গান্ধিজীর ছবি, অন্যদিকে নেলসন ম্যান্ডেলার ছবি। এছাড়া থাকে দুই দেশের পতাকা।
এদিন রিচা ঘোষকে সম্মানিত করতে পেরে আপ্লুত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি এদিন বলেন, ‘খেলাধুলায় বাংলা সবসময় এগিয়ে থাকে। আগে হয়তো এত গুরুত্ব দেওয়া হত না। কিন্তু সবকিছুই শুরু করতে সময় লাগে। ৯১ সালে আমি যখন ইউথ অ্যান্ড স্পোর্টস মিনিস্টার হলাম, আমার হাত দিয়ে দ্রোণাচার্য সম্মান পেলেন নইমুদ্দিন, শচীন তেন্ডুলকরের কোচ রমাকান্ত আচরেকর পেয়েছিলেন। সুব্রত ভট্টাচার্য পেয়েছিলেন অর্জুন পুরস্কার। অলিম্পিকে ভারত হেরে গেল, সেই সময় আমি ইন্ডিয়ান পলিসি করেছিলাম স্পোর্টসের। প্রাইভেট সেক্টর, পাবলিক সেক্টরকে নিয়ে স্পোর্টস অ্যাকাডেমি করেছিলাম। ঝুলনরা একটুর জন্য বিশ্বকাপ পায়নি, রিচারা পেয়েছে। ঝুলনদের কাজের ফল পেয়েছে ওরা। আমি রিচার পাশাপাশি ওই সব বন্ধুদের অভিনন্দন জানাচ্ছি। ওর সিলেক্টর শ্যামাদেবীকে অভিনন্দন। আমাদের শ্রদ্ধা রিচার বাবা মাকে। আমি ব্ব্যক্তিগতভভাবে খুব খুশি। আমাদের মেয়েরা এগিয়ে যাক। ফুটবল, সাঁতার, তীরন্দাজি সব ক্ষেত্রে ছেলে মেয়েরা দারুণ করছে। রিচার থেকে আমরা প্রত্যাশা করব নিশ্চয়, কিন্তু মানসিক চাপ দেব না।’ জানা গেল নব্বইয়ের দশকে দিল্লিতে পুরুষ ও মহিলা সাংসদদের নিয়ে একটি ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে সেরা খেলোয়াড় মনোনীত হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এদিন ইডেনে ফুল দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছে রিচার বাবা মাকেও। রিচাকে তৈরি করেছেন তো তাঁরাই। দীর্ঘদিন ধরে সিএবি’র আম্পায়ার রিচা ঘোষের বাবা। তাঁর নিরলস পরিশ্রমের ফলেই বাংলার গর্ব ২২ বছরের তরুণী কন্যা আজ বিশ্বকাপজয়ীর দলের সদস্য। রিচার প্রতিভাকে প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা বোলার ঝুলন গোস্বামী। রিচাকে খুঁজে পেয়েছিলেন তিনিই। এদিন মঞ্চ থেকে সেদিনের গল্প ভাগ করে নিলেন সবার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘২০১৩ সালে ভারতীয় মহিলা দল খুব ভাল খেলতে পারেননি। বাংলার ক্রিকেটেও সেভাবে উন্নতি হয়নি। আমি তখন সিএবি সেক্রেটারি বিশ্বরূপ দে, গৌতম স্যার, বাবলু স্যারকে জিজ্ঞাসা করি আমরা কি ডিস্ট্রিক্টে ট্যালেন্ট হান্ট প্রোগ্রাম করতে পারি। আমার কথায় তাঁরা সমর্থন করেন। সেই সূত্রেই আমার রিচাকে দেখা। প্রথম শিলিগুড়িতে গিয়ে অনূর্ধ্ব ১৫ ও অনূর্ধ্ব ১৬ তে আমি ওকে দেখেছিলাম। আমি ফিরে বলি সিএবি কর্তাদের জানাই আমাদের কাছে কিন্তু প্রচুর ট্যালেন্টেড ক্রিকেটার আছে। তাঁদের সাপোর্ট করতে পারলে ভবিষ্য্যতে দেশের মুখ উজ্জ্বল হবে। রিচা এত ট্যালেন্টেড ছিল, ওই বয়সে আমি আর কাউকে দেখিনি। এরপর বেঙ্গল টিমে ও সিলেক্ট হয়। সেই সময় সৌরভ স্যার প্রেসিডেন্ট, অভিষেক স্যার সেক্রেটারি। আমি বলি যে ওকে সিনিয়র টিমে সিলেক্ট করতে চাই, অনেকেই তখন বলেছিলেন ও এখনও অনেক ছোট। এখুনি সিনিয়রে আনার দরকার নেই। কিন্তু স্যারেরা আমাকে সাপোর্ট করেন। তারপর তো ইতিহাস। একের পর এক জয় পেয়েছে। গত ৪৭ বছর ধরে ভারতীয় মহিলা দল যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা পূরণ করল এবার রিচা, হরমন, স্মৃতি সকলে মিলে। ওদের অসংখ্য ধন্যবাদ। রিচার জার্নির এই শুরু, আরও অনেক দূরে এগিয়ে যেতে হবে ওকে।’
এদিন মঞ্চ থেকে ঝুলন গোস্বামী ধন্যবাদ জানিয়েছেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে। আইসিসির সচিব এদিন বলেন, ‘আগে মহিলা ক্রিকেট তো অর্থনৈতিক দিক থেকে এত ভাল ছিল না। আজ যেখানে পৌঁছে তা ঝুলন, মিতালীদের চেষ্টায়। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী আমাকে অনুরোধ করেছিলেন মহিলা ক্রিকেটকেও যেন উন্নত করা হয়। রিচাকে আমাদের সকলের তরফ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন। রিচা শুধু একজন ভাল খেলোয়াড় নয়, ও যে ৬ নম্বরে এসে ব্যাটটা করে সেটা সবচেয়ে কঠিন। ওর মূল্য ভারতীয় দলে স্মৃতি, হরমন কারও থেকে কম নয়। আমরা যেন কোনও একটা দিন বলতে পারি রিচা, ভারত অধিনায়ক।’