সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘বদলা নেওয়ার দিন আসছে। এবার হবে গণতন্ত্রের বদলা। মনে রাখবেন, নববর্ষ আসছে। মানে নতুন ভোর আসছে, নতুন দিন আসছে। আর বিজেপির বিরুদ্ধে বদলা নেওয়ার দিন এগিয়ে আসছে।’ রবিবাসরীয় নির্বাচনী জনসভার মঞ্চ থেকে বাঁকুড়ার ছাতনায় এভাবেই বিজেপির বিরুদ্ধে বাংলার মানুষদের রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানালেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের বাক্সে সেই বদলা নিতে হবে। এবারের ভোট কিন্তু অন্যরকম। তাই সবার কাছে আমার আবেদন থাকবে যে, এনআরসি করে যাতে কারও নাম বাদ না পড়ে এবং আপনার সমস্ত অধিকার যাতে সুরক্ষিত থাকে সেটা মাথায় রাখবেন। সেইজন্য এবারের ভোটটা আসলে একটা মরণ-বাঁচন লড়াই।’
বিজেপিকে আরও একবার বাংলা বিরোধী বলে দাবি করে বাংলাকে বাঁচানোর স্বার্থে তৃণমূলকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মমতা বলেন, ‘বিজেপি আসলে চাইছে যে, গোটা দেশে একটাই পার্টি থাকুক। তাই এবার ওরা ডিলিমিটেশন বিল আনতে চায়। আমি এখানে দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ করে বলে যাচ্ছি, সেই বিল আসছে। বাংলাকে ওরা টুকরো টুকরো করতে চাইছে। আমি জানি না যে, কোন রাজ্যের সঙ্গে কোন রাজ্যকে মেলাতে চাইছে ওরা। এবার ওরা জোর করে বাংলা দখল করতে চাইছে। কিন্তু আমি বলে দিলাম, সেটা করতে পারবে না। যারা এসআইআর-এর সময় আপনাদের পাশে থাকেননি, তাদের একটা ভোটও দেবেন না। মনে রাখবেন, এসআইআর হল একটা বড়সড় দুর্নীতি। এসআইআর-এর নামে ওরা আসলে সর্বনাশ করতে চাইছে বাংলায়।’
আবার পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোলে দাঁড়িয়ে বিজেপির সংকল্প পত্র এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আসছেন তার পাল্টা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, ‘আসানসোলে অনেক সংস্থা আসছে। আসানসোল-রানিগঞ্জ লজিস্টিকাল হাব হবে। এখানকার ছেলে-মেয়েরা যাতে কাজের সুযোগ পায়। অনেক শিল্পপতি কাজ করছেন। রানিগঞ্জের মানুষের জন্য বাড়ি বানিয়ে রেখেছি, যাতে ধসে কারও প্রাণ না যায়। আপনাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। শিফটিংয়ের খরচ দেওয়া হবে। ডেউচা পচামি তৈরি করছি। এক লক্ষ লোকের চাকরি হবে। দেশের গণতন্ত্র, সংবিধান বাঁচাতে হবে। ইডি-সিবিআই দেখালে ভয় পাবেন না। টাটা-বাই বাই করবেন। বিজেপি নেতাদের এত চুরি-ডাকাতি, কেউ গ্রেফতার হয়েছে? সব ধোওয়া তুলসীপাতা। ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানে না। অত্যাচার করছো কেন? ভোট আসলেই ভয় দেখাতে হবে। বাংলার অফিসারদের বাইরে পাঠাবে। বিজেপির লোকদের বেছে বেছে আনছে। ভোটের দিন মা-বোনদের ব্যাগ চেক করবে। আপনারা লড়াই করতে পারবেন তো? লড়তে হলে আমার সামনে বোসো। সব এজেন্সিকে নিয়ে এসো। সব দিল্লি কা লাড্ডু। বাংলায় নাড়ু হয়। ৪ তারিখ ফল। তার পরে চার হাঁড়ি নাড়ু পাঠাব। অনুপ্রবেশকারী কারা? এখানে আশ্রয় দিয়ে কাকে কাকে রাখা হয়েছে বলব? বিএসএফ ওদের অধীনে। সরকারে থেকেও অত্যাচারিত হতে হয় আমাকে। সিপিএমের আমলেও হয়। সকাল থেকে সন্ধ্যা অত্যাচারিত হই। রাস্তা, আবাস, ১০০ দিনের কাজের টাকা বন্ধ। চা বাগানের পাট্টা আমি দিয়েছি। এক জন প্রধানমন্ত্রী এত কী ভাবে মিথ্যা বলেন? আমরা যা বলি, তা করি। রানিগঞ্জে ধস নেমে ধুলিস্যাৎ হচ্ছে। কয়লার পাহারাদার তোমরা। তোমার সিআইএসএফ পাহারা দেয়। তৃণমূল কী করে চোর হল? তোমাদের নেতা, মন্ত্রীরা মাসে মাসে কোটি কোটি টাকা তুলে নিয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ারের দাম রয়েছে। এ সব কথা বলেন কী করে? বিজেপির নেতারা কানে কানে কথা বলে। সত্যি বলে না। ধোঁকা দেয়। সব শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে। বড় কথা!
২০২১ সালের আগে চায়ের বাগান বলেছিলে অধিগ্রহণ করবে, একটাও করেছো? ডানলপ অধিগ্রহণ করব বলে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলাম ২০১৬ সালে। এখনও কিছু করোনি। এখনও কর্মীদের মাসে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়। তোমার দিল্লি সরকার বদলাব। বলেছিলেন, ব্যাঙ্কে ১৫ লক্ষ টাকা দেবে। কেউ পেয়েছেন? বলেন, বছরে ২ কোটি চাকরি দেবেন। এখন বাংলায় এসে বলছেন, সব শূন্যপদ পূরণ করবে। রেলে গ্যাংমান নিয়োগ করেছেন? প্রতিরক্ষা মন্ত্রকে শূন্যপদ পূরণ করেছেন? রেল বাজেট তুলে দিয়েছেন। চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ শেষ হয়ে যাচ্ছিল। আমরা করেছি। অন্ডাল বিমানবন্দর আমরা করেছি। আসানসোল-দুর্গাপুর নতুন জেলা, পুলিশ কমিশনার করে দিয়েছি। কোনও দুর্যোগে কি আসেন? হিংসা করাতে আসেন। ভোটের সময় বসন্তের কোকিলের মতো আসে। তার পরে জিনিসের দাম বাড়ায়।’
মহিলাদের হেনস্থার অভিযোগ
‘মেয়েদের ব্যাগ খুলে কী কী ব্যবহার করে, সেটাও টেনে বার করা হচ্ছে! লজ্জা করে না?’ খণ্ডঘোষের জনসভা থেকে এমনই তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটের মুখে মহিলাদের ব্যাগ তল্লাশির অভিযোগে সরব হলেন। কাঞ্চন মল্লিকের স্ত্রী শ্রীময়ী চট্টরাজের অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে এনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কটাক্ষ করে বলেন, ‘মেয়েদের ব্যাগ থেকে লিপস্টিক পরবে? নাকি মেয়েরা যেসব ব্যবহার করে, সেগুলি নেবে?’
রবিবার বর্ধমানের খণ্ডঘোষের লোদনা ফুটবল গ্রাউন্ডে জনসভায় বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। অভিযোগ তোলেন, ‘চেক করার নামে অশ্লীলতা হচ্ছে। মেয়েদের ব্যক্তিগত জিনিস প্রকাশ্যে বার করে অপমান করা হচ্ছে। কয়েকদিন আগে আমার ভবানীপুরেরও একজন বয়স্ক মহিলা; খুবই বর্ধিষ্ণু পরিবারের মহিলা; আমি শুনলাম তাঁকে হ্যারাস করেছে তাঁর গাড়ি খুলে। গাড়ি খুলতেই পারেন। চেক করতেই পারেন। কিন্তু আপনি মেয়েদের ব্যাগ খুলে মেয়েরা কী কী ব্যবহার করে দেখবেন? কেন? লিপস্টিক পরবেন? নাকি ফেসিয়াল করবেন? নাকি মেয়েরা যেগুলো ব্যবহার করে সেগুলো ব্যবহার করে; করবেন। লজ্জা করে না? অশ্লীলতার চূড়ান্ত করছে। যারা করছে তাদের আমি বলে দিই। অশ্লীলতা করলে মেয়েরা কমপ্লেন করবেন।’

সম্প্রতি অভিনেত্রী শ্রীময়ী চট্টরাজের অভিযোগ ঘিরে তোলপাড় হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। রাতে শ্যুটিং থেকে ফেরার সময় নাকা চেকিংয়ে তাঁকে হেনস্থা করা হয় বলে অভিযোগ। তাঁর দাবি, পুরুষ পুলিশকর্মীরা তাঁর ব্যাগ খুলে স্যানিটারি প্যাড-সহ ব্যক্তিগত জিনিস বার করেন। সেই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘হ্যারাসমেন্ট হয়েছে। চেক করার নামে মেয়েদের ব্যাগ খুলে ব্যাগে কি কি আছে। এমনকি মেয়েদের ব্যবহৃত জিনিস লজ্জা লাগে বলতে, সেগুলি পর্যন্ত টেনে টেনে বার করে অসম্মান করা হয়েছে।’