রাহুল সিংহ মজুমদার। কলকাতা সারাদিন।
পাঁচ বছরে সম্পত্তি বেড়েছে পাঁচ গুণ! গয়নার বাক্সে ১০০ ভরি সোনা, ব্যাঙ্কে কোটি টাকার সঞ্চয়—তবুও নিজের নামে নেই একটি বাড়িও। ঠিক এই বৈপরীত্য ঘিরেই এখন রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চার কেন্দ্রবিন্দু সোনারপুর দক্ষিণের তৃণমূল বিধায়ক লাভলি মৈত্র।
২০২১ সালে প্রথমবার ভোটে লড়ে জেতার পর থেকে এবারের নির্বাচন পর্যন্ত তাঁর আর্থিক অবস্থার এই নাটকীয় পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামায় যে তথ্য উঠে এসেছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।
🎭 অভিনয় থেকে রাজনীতি, তারপর সম্পদের উত্থান
অভিনয় জগত থেকে রাজনীতিতে আসা লাভলি মৈত্র, যিনি অরুন্ধতী মৈত্র নামেও পরিচিত, ২০২১ সালে তৃণমূলের টিকিটে সোনারপুর দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে জিতে প্রথমবার বিধায়ক হন। সেই সময় তিনি ছিলেন খড়দহের ভোটার। তবে বিধায়ক হওয়ার পর নিজের রাজনৈতিক কেন্দ্রেই ঠিকানা বদল করেন।
এবারও সেই কেন্দ্র থেকেই প্রার্থী হয়েছেন তিনি। তবে এইবারের লড়াই আরও কঠিন। সিপিএম, কংগ্রেস এবং বিজেপি—তিনটি দলই শক্তিশালী প্রার্থী দিয়েছে। বিশেষ করে বিজেপির তরফে প্রার্থী হয়েছেন অভিনেত্রী-রাজনীতিক রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। ফলে এই কেন্দ্রে মূল লড়াই যে হাই-ভোল্টেজ হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।
💰 সম্পত্তির হিসাবেই চমক
২০২১ সালে লাভলির মোট অস্থাবর সম্পত্তি ছিল প্রায় ৪৮ লক্ষ ৮৭ হাজার টাকা। পাঁচ বছরের ব্যবধানে সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৬৯ লক্ষ ৩৮ হাজার টাকায়—অর্থাৎ প্রায় পাঁচ গুণ বৃদ্ধি!
শুধু লাভলি নন, তাঁর স্বামী সৌম্য রায়ের সম্পত্তিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আগে যেখানে তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪১ লক্ষ টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকারও বেশি।
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, স্থায়ী আমানত, পিপিএফ—সব মিলিয়ে তাঁদের আর্থিক বিনিয়োগ এখন কোটি ছুঁয়েছে। লাভলির একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে রয়েছে লক্ষ লক্ষ টাকা। এছাড়া রয়েছে স্থায়ী আমানত, সরকারি সঞ্চয় প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং জীবনবিমা।
তবে আশ্চর্যের বিষয়—এত সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও তাঁদের কারও নামেই নেই কোনও জমি বা বাড়ি!
🪙 গয়নায়ও বিপুল বৃদ্ধি
সম্পত্তির পাশাপাশি গয়নাতেও চোখে পড়ার মতো বৃদ্ধি হয়েছে। ২০২১ সালে লাভলির কাছে ছিল ৭৫ ভরি সোনা। এখন সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০০ ভরিতে। বর্তমান বাজারমূল্যে যার দাম প্রায় ১ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা।
অন্যদিকে তাঁর স্বামীর গয়নার পরিমাণও বেড়েছে। আগে যেখানে ছিল ৪০ ভরি, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৫০ ভরি। যার বাজারমূল্য প্রায় ৬৭ লক্ষ টাকার কাছাকাছি।
সব মিলিয়ে স্বামী-স্ত্রীর গয়নার মোট মূল্য কোটি টাকারও বেশি—যা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
🚗 নতুন গাড়ি, নতুন ঋণ
২০২১ সালে তাঁদের নামে কোনও গাড়ি ছিল না। কিন্তু ২০২৩ সালে লাভলি প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা দিয়ে একটি গাড়ি কেনেন। এবারের হলফনামায় সেই তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন—এইবার তাঁর নামে রয়েছে ৫০ লক্ষ টাকার ঋণ। ২০২১ সালে যেখানে কোনও ঋণ ছিল না, সেখানে এখন বড় অঙ্কের লোন নেওয়াও নজর কেড়েছে।
💸 আয়করেও বড় অঙ্ক
আয়ের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়েছে। সর্বশেষ আর্থিক বছরে লাভলি আয়কর দিয়েছেন প্রায় ৩৮ লক্ষ টাকা। তাঁর স্বামী দিয়েছেন প্রায় ২৩ লক্ষ টাকার আয়কর। অর্থাৎ তাঁদের বার্ষিক আয়ের পরিমাণও যথেষ্ট উচ্চস্তরে পৌঁছেছে।
⚖️ বিতর্কের মাঝেও ‘ক্লিন’ ইমেজ
রাজনৈতিক বিতর্ক যতই থাকুক, একটি জায়গায় কিন্তু এখনও ‘ক্লিন’ ইমেজ ধরে রেখেছেন লাভলি। তাঁর বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি মামলা নেই। কোনও থানায় এফআইআর হয়নি, এমনকি কোনও মামলায় চার্জ গঠনও হয়নি।
২০২১ সালেও যেমন তাঁর নামে কোনও অভিযোগ ছিল না, এখনও সেই অবস্থাই বজায় রয়েছে।
🎓 শিক্ষাগত যোগ্যতা
২০২০ সালে নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলাবিভাগে স্নাতক হন লাভলি। পড়াশোনার সময় থেকেই অভিনয় শুরু করেন। টেলিভিশনের কয়েকটি সিরিয়ালে অভিনয়ের মাধ্যমে পরিচিতি পান, সেখান থেকেই তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু।

একদিকে বিপুল সম্পদ বৃদ্ধি, অন্যদিকে নিজের নামে কোনও বাড়ি না থাকা—এই দ্বৈত চিত্র এখন রাজনৈতিক মহলে বড় প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। ভোটের আগে এই তথ্য কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন দেখার।

সোনারপুর দক্ষিণের লড়াই তাই শুধু রাজনৈতিক নয়—এখন তা পরিণত হয়েছে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ও জনমানসের আস্থার পরীক্ষায়।