রাহুল সিংহ মজুমদার। কলকাতা সারাদিন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার নরেন্দ্রপুরে এক যুবকের রহস্যমৃত্যুকে ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা এলাকায়। প্রেম, টাকা আর হঠাৎ গুলির শব্দ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক জটিল রহস্যের জাল। নবগ্রামের একটি ফ্ল্যাট থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার হওয়া অরূপ মণ্ডল (৩৭)-এর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত রবিবার গভীর রাতে রাজপুর-সোনারপুরের নরেন্দ্রপুর থানার অন্তর্গত নবগ্রাম এলাকায় নিজের ফ্ল্যাটেই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় অরূপকে। স্থানীয় বাসিন্দারা আচমকা গুলির শব্দ শুনে চমকে ওঠেন। এরপরই পুলিশে খবর দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ অরূপের নিথর দেহ উদ্ধার করে। ঘর থেকে উদ্ধার হয় দুটি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ছয় রাউন্ড গুলি—যা এই রহস্যকে আরও গভীর করেছে (Narendrapur murder mystery)।
অরূপ মণ্ডল পেশায় ইমারতি সামগ্রীর ব্যবসায়ী ছিলেন। তদন্তে উঠে এসেছে, প্রিয়াঙ্কা দাস নামে এক মহিলার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। প্রায় পাঁচ বছর আগে জমি বিক্রির সূত্রে তাঁদের পরিচয় হয় এবং ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতায় পৌঁছায় (relationship crime case)। তবে এই সম্পর্কের মধ্যে অর্থনৈতিক টানাপোড়েনই কি শেষ পর্যন্ত প্রাণ কেড়ে নিল অরূপের? সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে তদন্তকারীদের মাথায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ব্যবসার জন্য প্রিয়াঙ্কার কাছ থেকে ধাপে ধাপে প্রায় ৪২ লক্ষ টাকা ধার নিয়েছিলেন অরূপ। কিন্তু সেই টাকা ফেরত না দেওয়া নিয়ে প্রায়ই দু’জনের মধ্যে অশান্তি চলত। পুলিশ জেরায় প্রিয়াঙ্কা নিজেও এই টাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন (money dispute murder)। ফলে এই আর্থিক দ্বন্দ্বই কি খুনের মোটিভ—তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
ঘটনার রাতে কী ঘটেছিল, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, ওই রাতে অরূপের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন প্রিয়াঙ্কা। তার কিছুক্ষণ পরই শোনা যায় গুলির শব্দ। এরপর কীভাবে ঘটনাটি ঘটল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এটি আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত খুন—দুই সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে (murder or suicide investigation)।
এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই প্রিয়াঙ্কা দাস এবং রাজু নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রাজু সম্পর্কে প্রিয়াঙ্কার খুড়তুতো ভাই বলে জানা গিয়েছে। অভিযোগ, ঘটনার দিন রাতে প্রিয়াঙ্কাই রাজুকে ওই ফ্ল্যাটে ডেকে পাঠান। যদিও জেরায় ধৃত দু’জনই দাবি করেছেন, তাঁরা কেউই গুলি চালাননি (crime interrogation update)। এই দাবি কতটা সত্য, তা যাচাই করতে বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
প্রিয়াঙ্কার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও সামনে এসেছে নতুন তথ্য। প্রায় তিন বছর আগে তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়। তিনি ছিলেন একজন সেনাকর্মী। এরপর শ্বাশুড়ি এবং মেয়েকে নিয়ে থাকতেন প্রিয়াঙ্কা। সেই সময় থেকেই অরূপের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কের গভীরতা এবং আর্থিক লেনদেন এখন তদন্তের মূল কেন্দ্রে (love affair crime India)।
অন্যদিকে, মৃতের পরিবারের দাবি, এটি নিছক আত্মহত্যা নয়, বরং পরিকল্পিত খুন। অরূপের ছোটমামা শঙ্কর নস্কর জানান, “ও বাঁ-হাতি ছিল। কিন্তু মাথার ডান দিকে আঘাত রয়েছে। এতে আমাদের সন্দেহ আরও বাড়ছে।” পরিবারের এই বক্তব্যে নতুন করে রহস্য দানা বেঁধেছে (family alleges murder)।
পুলিশ এখন ধৃতদের জেরা করে জানার চেষ্টা করছে, ঘটনার সময় ঠিক কোথায় ছিলেন প্রিয়াঙ্কা এবং রাজু। কোনওভাবে হুমকি বা চাপ তৈরি করা হয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ফরেনসিক রিপোর্ট এবং কল ডিটেইলস বিশ্লেষণ করে পুরো ঘটনার ছক স্পষ্ট করার চেষ্টা চলছে।

নরেন্দ্রপুরের এই রহস্যমৃত্যু এখন স্থানীয়দের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। প্রেম, প্রতারণা, টাকা এবং মৃত্যু—সব মিলিয়ে এটি যেন এক বাস্তব থ্রিলার। শেষ পর্যন্ত এটি খুন নাকি আত্মহত্যা, তার উত্তর মিলবে তদন্ত শেষ হলেই।