সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
আমি মনে করি এপিক কার্ডকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। ভোটার কার্ড একটি পরিচয় পত্র। আধার কার্ডকে মান্যতা দেওয়া হয়েছে এবং অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রত্যেকেরই আধার কার্ড রয়েছে। যাঁদের নেই তাঁরা বানিয়ে নেবেন। সুপ্রিম কোর্ট আধার কার্ড কে ভারতীয় নাগরিকদের পরিচয় পত্র হিসেবে মান্যতা দেওয়ার প্রেক্ষিতে আজ উত্তরবঙ্গ যাওয়ার আগে এভাবেই সচিত্র ভোটার পরিচয় পত্রকেও মান্যতা দেওয়ার দাবি তুলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। প্রসঙ্গত ভোটারদের সচিত্র পরিচয় পত্র চালু করার জন্য মমতার আন্দোলনের জেরেই ভারতবর্ষের বুকে চালু হয়েছিল সচিত্র ভোটার পরিচয় পত্র বা এপিক কার্ড। এপিক কার্ডের দাবিতে মমতার আন্দোলনে রুখে দিতে ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই তৎকালীন সিপিএমের সরকার গুলি চালিয়ে নির্বিচারে হত্যা করেছিল আন্দোলনকারীদের।
এর পাশাপাশি বিহারের আদলে বাংলাতেও ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়া চালুর যে উদ্যোগ জাতীয় নির্বাচন কমিশন এবং ভারতীয় জনতা পার্টি শাসিত কেন্দ্রীয় সরকার গ্রহণ করেছে তার বিরুদ্ধে আরো একবার দলের তথা রাজ্য সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়ে আজ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা এসআইআর-এর বিরুদ্ধে। তিনজন প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বলেছেন যে, এসআইআর করতে ২–৩ বছর সময় লাগে, হঠাৎ করে করা যায় না। আমাদের দলের অবস্থান স্পষ্ট এবং সেটা ইন্ডিয়া ব্লকের অবস্থানের সঙ্গে একই।
নেপালের পরিস্থিতি প্রসঙ্গে
নেপালে গতকাল থেকে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে পতন হয়েছে সেখানকার সরকারের। তবে অন্য দেশের রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে মন্তব্য করতে না চাইলেও নেপালের পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রশ্নের প্রেক্ষিতে নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করে মমতা বলেন, নেপাল আমার দেশ নয়, এটা একটি পড়শি দেশ, তাই আমি এবিষয়ে মন্তব্য করতে পারি না। এই ব্যাপারে মন্তব্য করবে ভারত সরকার। তবে এটা আমাদের প্রতিবেশী দেশ এবং আমরা নেপাল, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, ভুটান ও সমস্ত সীমান্তবর্তী দেশকে ভালোবাসি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে, যদি ভারতের সরকার আমাদের কিছু বলে, তখনই আমরা কিছু বলব। তা না হলে এটা কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয়। আমার অনুরোধ, আমাদের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে শান্তি বজায় রাখুন এবং নিশ্চিত করুন যাতে কেউ কোনো সমস্যায় না পড়েন, কারণ এটা আমাদের বিষয় নয়। নেপাল তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিক, যদিও আমরা তাদের ভালোবাসি। এতে আমাদের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। তবে আমি এটাও বিশ্বাস করি যে, আমাদের প্রতিবেশী ভালো থাকলে আমরাও ভালো থাকব। শান্তি বজায় থাকুক। ভারত সরকার এখনো আমাদের কিছু জানায়নি। আমাদের মানুষ কেন সমস্যায় পড়বে? শান্তি ফিরে না আসা পর্যন্ত আমাদের মানুষজন কেন বিপদে পড়বে? আর এটা তো আমাদের বিষয়ও নয়। বাংলার সাংবাদিকদের নেপালে খবর সংগ্রহ করতে যাওয়া নিয়েও সতর্ক করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সেখানে খবর কভার করতে যাবেন না। এখান থেকেও কভার করতে পারেন। নিরাপত্তা আগে নিশ্চিত হওয়া উচিত, আর যদি যান, তবে এখানকার পুলিশকে অবশ্যই জানান।
উত্তরবঙ্গের কর্মসূচি
জেলাশাসকদের সঙ্গে আমার উন্নয়নমূলক কর্মসূচি নিয়ে বৈঠক আছে এবং পাট্টা বিতরণও আছে। আগামীকাল আমি জলপাইগুড়ি যাব। আমাদের কাছে ১১,০০০ পাট্টা প্রস্তুত আছে। উত্তরবঙ্গের জন্য বাড়ি তৈরির পরিকল্পনাও করা হয়েছে। পরের দিন আমি ফিরব। খারাপ আবহাওয়ার কারণে আমাদের গাড়িতে যেতে হবে।

পঞ্চানন বর্মাকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন
উত্তরবঙ্গ সফরের আগে সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে পঞ্চানন বর্মাকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতা লিখেছেন, রাজবংশী সমাজের প্রাণপুরুষ, রায়সাহেব ঠাকুর পঞ্চানন বর্মা-র প্রয়াণদিবসে এই প্রবাদপ্রতিম মানুষকে জানাই আমার অন্তরের শ্রদ্ধা ও প্রণাম। কিন্তু আমি মনে করি, এই মহান প্রাণের মৃত্যু নেই। তাঁর ভাবনা ও আদর্শ সারা দেশের মানুষকে আগেও উদ্বুদ্ধ করেছে, এখনো করছে, আগামীদিনেও উদ্বুদ্ধ করবে। এটা আমার গর্ব, তাঁকে সম্মান জানিয়ে আমরা তাঁর নামে কোচবিহারে পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয় করেছি। ঠাকুর পঞ্চানন বর্মার জন্মস্থান, খলিসামারির পুণ্যভূমিতে এর দ্বিতীয় ক্যাম্পাসও চালু হয়েছে। ঠাকুর পঞ্চানন বর্মার জন্মদিনে ছুটি ঘোষণাও করা হয়েছে। তাঁর বাড়িকে সংস্কার করে ‘পঞ্চানন বর্মা সংগ্রহশালা ও গবেষণাকেন্দ্র’ নামে মিউজিয়াম স্থাপন এবং ঠাকুর পঞ্চানন বর্মার পূর্ণাবয়ব মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। রাজবংশী মানুষদের জন্যও আমরা অনেক কিছু করেছি – রাজবংশীকে সরকারী ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, আমরা কামতাপুরী, সাঁওতালী, কুরুখ, কুড়মালী, নেপালী, হিন্দি, উর্দু, রাজবংশী, ওড়িয়া, পাঞ্জাবী, তেলুগু ভাষাকেও সরকারী ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছি। সাদরি ভাষার মানোন্নয়নেও আমরা সচেষ্ট হয়েছি। রাজবংশী ডেভেলপমেন্ট বোর্ড, রাজবংশী কালচারাল একাডেমি, রাজবংশী ভাষা একাডেমি, কামতাপুরী ভাষা একাডেমি গঠন করা হয়েছে। প্রায় ২০০টি রাজবংশী স্কুলকে সরকারি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। রাজ্য পুলিশে ‘নারায়ণী’ ব্যাটেলিয়ন গঠন (হেডকোয়ার্টার – মেখলীগঞ্জ) করা হয়েছে। বাবুরহাটে মহাবীর চিলা রায়ের ১৫ ফুট উঁচু ব্রোঞ্জের মূর্তি বসানো হয়েছে।
কোচ – কামতাপুরী – রাজবংশী জনসাধারণের ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে কোচবিহার শহরটিকে হেরিটেজ শহর হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।