সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এ যেন এক ‘সুপার স্যাটারডে’। দীর্ঘ ১১৬ দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে প্রকাশিত হল Bengal SIR-এর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা। আর সেই তালিকা ঘিরেই শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক, রাজনৈতিক চাপানউতোর এবং সাধারণ ভোটারদের উদ্বেগ।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, খসড়া ও চূড়ান্ত তালিকা মিলিয়ে মোট ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২ জনের নাম বাদ পড়েছে। শুধু চূড়ান্ত তালিকায়ই ফর্ম ৭-এর মাধ্যমে বাদ গেছে ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ৫৩ জনের নাম। তার আগে খসড়া তালিকায় বাদ পড়েছিল ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৯ জনের নাম। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা যে কোনও নির্বাচনের আগে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ভোটার সংখ্যা কমল কেন?
২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর, SIR শুরু হওয়ার আগে রাজ্যে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫২৯। ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত খসড়া তালিকায় সেই সংখ্যা নেমে দাঁড়ায় ৭ কোটি ৮ লক্ষ ১৬ হাজার ৬৩০। আর সদ্য প্রকাশিত প্রথম ধাপের চূড়ান্ত তালিকায় ভোটার সংখ্যা ৭ কোটি ৪ লক্ষ ৫৯ হাজার ২৮৪।
অর্থাৎ, গোটা প্রক্রিয়ায় প্রায় এক কোটির কাছাকাছি ভোটারের নাম নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ, ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’-র তালিকায় এখনও ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জনের নাম বিচারাধীন। জুডিশিয়াল অফিসাররা তাঁদের নথি যাচাই করছেন। নিষ্পত্তি হলে উপযুক্ত নামগুলি ঘোষণা করা হবে।
আপনার নাম ‘ডিলিটেড’? কী করবেন?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—চূড়ান্ত তালিকায় যাঁদের নাম ‘ডিলিটেড’ দেখাচ্ছে, তাঁদের সামনে কী পথ খোলা আছে?
রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ কুমার আগরওয়াল স্পষ্ট জানিয়েছেন, যাঁদের নাম ইতিমধ্যেই বাদ গেছে, তাঁদের মধ্যে ৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ আবেদন করতে পারবেন। তাঁরা সরাসরি DEO (District Election Officer) বা CEO-র কাছে আবেদন জানাতে পারেন। এই আবেদন প্রক্রিয়া ‘অ্যাজুডিকেশন’-এর বাইরে। অর্থাৎ, এটি বিচারবিভাগীয় জটিল পদ্ধতি নয়—প্রশাসনিক স্তরেই নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে।
কোন ফর্মে কী হয়েছে?
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী—
ফর্ম ৬ ও ৬A পূরণ করে নতুন করে নাম উঠেছে ১ লক্ষ ৮২ হাজার ৩৬ জনের।
ফর্ম ৮ জমা দিয়ে সংশোধন বা স্থানান্তরের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছে আরও ৬ হাজার ৬৭১ জন।
ফর্ম ৭-এর মাধ্যমে বাদ গেছে ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ৫৩ জনের নাম।
অর্থাৎ, একদিকে যেমন নাম বাদ পড়েছে, অন্যদিকে নতুন নামও যুক্ত হয়েছে। তবে বাদ পড়ার সংখ্যাটা অনেক বেশি হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে।
ভবানীপুর বনাম নন্দীগ্রাম
রাজনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে আলোচিত হয়েছে দুই কেন্দ্র—ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম।
মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্র ভবানীপুরে বাদ পড়েছে ৪৭ হাজার ১২৯ জনের নাম। অন্যদিকে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী-র কেন্দ্র নন্দীগ্রামে বাদ পড়েছে ১০ হাজার ৯৯৬ জনের নাম।
শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, তাঁর কেন্দ্রে ‘মৃত ভোট’ বা ‘অনুপস্থিত ভোট’-এর কোনও প্রয়োজন নেই। ইঙ্গিত স্পষ্ট—তিনি ভবানীপুরের সংখ্যাকে সামনে রেখে পাল্টা রাজনৈতিক আক্রমণ শানিয়েছেন।
তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ অবশ্য অন্য সুরে বলেছেন—যে কেন্দ্র নিয়ে বিজেপি এত প্রশ্ন তুলছে, সেখানে শেষ নির্বাচনে কত শতাংশ ভোট পড়েছিল এবং কত শতাংশ পড়েনি, তা মিলিয়ে দেখলেই সব পরিষ্কার হবে। তাঁর কথায়, বাদ পড়া নামের সঙ্গে অনুপস্থিত ভোটারের অনুপাত মিললেই অনেক অভিযোগ ‘জল হয়ে যাবে’।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এই সংখ্যাগুলি নিছক পরিসংখ্যান নয়। সামনে ভোট। তার আগে একসঙ্গে ৬৩ লক্ষের বেশি নাম বাদ পড়া নিঃসন্দেহে বড় রাজনৈতিক ইস্যু। বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছে—এই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ? অন্যদিকে শাসক দল বলছে—এটি নিয়মিত রোল রিভিশনের অংশ, যেখানে মৃত, স্থানান্তরিত বা অযোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়াই স্বাভাবিক।
তবে ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’-র আওতায় থাকা ৬০ লক্ষের বেশি নামই এখন আসল চাবিকাঠি। যদি এই তালিকা থেকে বড় অংশের নাম চূড়ান্তভাবে বাদ যায়, তবে ভোটের সমীকরণে তার প্রভাব পড়বে নিশ্চিতভাবেই।
সাধারণ ভোটারদের জন্য বার্তা
রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে সবচেয়ে জরুরি বিষয়—আপনার ভোটাধিকার। তালিকায় নাম আছে কি না, তা যাচাই করা এখন প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। যদি নাম ‘ডিলিটেড’ দেখায়, আতঙ্কিত না হয়ে নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করে দ্রুত আবেদন করুন। প্রয়োজনে জেলা নির্বাচন দফতরে যোগাযোগ করুন।
নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট বক্তব্য—যথাযথ নথি থাকলে আবেদন বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ, পথ বন্ধ নয়। তবে সময় নষ্ট করলে সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে।
শেষ কথা
Bengal SIR Final List 2026 শুধু একটি প্রশাসনিক নথি নয়, এটি আসন্ন ভোটযুদ্ধের প্রাক্-অধ্যায়। একদিকে বাদ পড়া ৬৩ লক্ষের বেশি নাম, অন্যদিকে বিচারাধীন আরও ৬০ লক্ষের বেশি ভোটার—সব মিলিয়ে প্রায় এক কোটিরও বেশি ভোটারের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপে।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলির কৌশল, প্রশাসনের স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতা—এই তিনটিই নির্ধারণ করবে চূড়ান্ত ফলাফল কতটা গ্রহণযোগ্য হবে।
আপনার নাম কি তালিকায় আছে? আজই যাচাই করুন। কারণ গণতন্ত্রে শেষ কথা বলে আপনার ভোটই।