প্রিয়াঙ্কা মান্না। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আরও একবার বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে প্রস্তুত ১৭তম এপিজে কলকাতা লিটারারি ফেস্টিভ্যাল (AKLF) ২০২৬। প্রতিবছরের মতো এবারও এই উৎসব শুধু বইপ্রেমীদের মিলনক্ষেত্রই নয়, বরং চিন্তা, মতাদর্শ, ইতিহাস, কবিতা ও সৃজনশীলতার এক গভীর সংলাপের মঞ্চ হয়ে উঠতে চলেছে। সুপরিকল্পিত অনুষ্ঠানসূচি, বিশিষ্ট বক্তা ও নতুন প্রজন্মের লেখকদের অংশগ্রহণে এবারের সংস্করণ হতে চলেছে আরও বেশি প্রাণবন্ত ও ভাবনাপ্রসূত।
২০২৬ সালের এই সাহিত্য উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হতে চলেছে বিশিষ্ট লেখক ও সাংসদ ড. শশী থারুরের নতুন বই The Sage Who Reimagined Hinduism–এর কলকাতা লঞ্চ। দ্য পার্ক, কলকাতায় অনুষ্ঠিত এই বিশেষ অনুষ্ঠান দিয়েই উৎসবের পর্দা নামবে। হিন্দুধর্মের দার্শনিক ও ঐতিহাসিক রূপান্তর নিয়ে লেখা এই বই পাঠক ও বুদ্ধিজীবী মহলে বিশেষ আলোচনার জন্ম দেবে বলেই মনে করা হচ্ছে। ড. থারুরের উপস্থিতি উৎসবের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এপিজে কলকাতা লিটারারি ফেস্টিভ্যালের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় অঙ্গ হল অক্সফোর্ড জুনিয়র লিটারারি ফেস্টিভ্যাল (OJLF)। অক্সফোর্ড বুকস্টোর, কলকাতা এবং আলিপুর মিউজিয়ামে আয়োজিত এই পর্বটি মূলত শিশু-কিশোর ও তরুণ পাঠকদের জন্য পরিকল্পিত। গল্প, কবিতা, ইন্টার্যাকটিভ আলোচনা এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে বইয়ের জগতে আকৃষ্ট করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
OJLF-এ গল্পকার ও লেখকদের মধ্যে থাকছেন হিমানজলি শঙ্কর, হেমাঙ্গিনী দত্ত মজুমদার এবং শোভা থারুর শ্রীনিবাসন। পাশাপাশি অনিতা নায়ার, স্যাভি কার্নেল ও জায়েল সিলিম্যানের মতো খ্যাতনামা লেখকদের সঙ্গে ইন্টার্যাকটিভ সেশন তরুণ পাঠকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে। লেখকদের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনের সুযোগ শিশুদের কল্পনাশক্তি ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করবে।
কবিতাপ্রেমীদের জন্য থাকছে বিশেষ আকর্ষণ—পোয়েট্রি ক্যাফে। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দু বেঙ্গলের সহযোগিতায় আয়োজিত এই পর্বটি অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহাসিক আলিপুর মিউজিয়ামের আবহে, যা কবিতার আবেগ ও স্মৃতিকে আরও গভীরভাবে ছুঁয়ে যাবে। এখানে প্রতিষ্ঠিত ও নবীন কবিরা একসঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নেবেন, সৃষ্টি হবে বহুভাষিক ও বহুপ поколенияর এক অনন্য সাহিত্যিক সংযোগ।
এই পোয়েট্রি ক্যাফেতে অংশ নেবেন বিশিষ্ট কবি বাসবি ফ্রেজার, সাহেবা সিং এবং অঞ্জনা বসু। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছে রহিমের দোহা নিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য, যার নেতৃত্ব দেবেন চন্দন সিনহা। এই পর্বে প্রাচীন কাব্যধারার সঙ্গে আধুনিক ভাবনার সেতুবন্ধন ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়াও রমনজিত কৌর, বৈশালী চট্টোপাধ্যায় দত্ত, অরুন্ধতী ঘোষ, সুফিয়া খাতুন, দেবাশিস লাহিড়ি ও বিনয় শর্মার মতো কবিরা তাঁদের কণ্ঠে কবিতার বৈচিত্র্য ও গভীরতা তুলে ধরবেন। তাঁদের অংশগ্রহণে এই কবিতা পর্ব হয়ে উঠবে এক সমৃদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুস্তরীয় সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা।
১৭তম এপিজে কলকাতা লিটারারি ফেস্টিভ্যাল কেবল একটি সাহিত্য উৎসব নয়, বরং কলকাতার আত্মার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এখানে সাহিত্য সমাজের সঙ্গে কথা বলে, ইতিহাস বর্তমানকে ছুঁয়ে যায়, আর কবিতা মানুষের অনুভূতির গভীরে পৌঁছে যায়।

সমৃদ্ধ অনুষ্ঠানসূচি, স্মরণীয় শ্রদ্ধার্ঘ্য এবং ব্যতিক্রমী বক্তাদের উপস্থিতিতে ২০২৬ সালের এই সংস্করণ হতে চলেছে সাহসী, চিন্তাশীল এবং কলকাতার সাংস্কৃতিক চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই উৎসব আবারও প্রমাণ করবে কেন এপিজে কলকাতা লিটারারি ফেস্টিভ্যাল শহরের বার্ষিক সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে নিজের জায়গা অটুট রেখেছে।
সাহিত্যপ্রেমী, শিক্ষার্থী, লেখক ও সংস্কৃতির অনুরাগীদের জন্য ২০২৬ সালের এপিজে কলকাতা লিটারারি ফেস্টিভ্যাল নিঃসন্দেহে এক অনিবার্য ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হতে চলেছে।