সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
২০০১ সাল। ইন্টারনেট ও আন্তর্জাতিক নিলামঘরগুলিতে হঠাৎ করেই কিছু অদ্ভুত ও রহস্যময় প্রত্নবস্তু বিক্রির বিজ্ঞাপন চোখে পড়তে শুরু করে। বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছিল, এই প্রত্নবস্তুগুলোর প্রাপ্তিস্থান মধ্য এশিয়ার কোনো এক অজানা অঞ্চল। প্রথমদিকে বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। বেশিরভাগ মানুষই ভেবেছিলেন, এগুলো হয়তো পুরাকীর্তি পাচারকারীদের বানানো নকল জিনিস—সহজেই ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করার আরেকটি কৌশল।
কিন্তু ২০০২ সালে পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে। আবারও নতুন কিছু প্রত্নবস্তু বিক্রির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়, এবং এবার সেগুলোর নকশা, খোদাই ও উপাদান দেখে প্রত্নতত্ত্ববিদরা নড়েচড়ে বসেন। এত সূক্ষ্ম কারুকাজ ও অস্বাভাবিক শিল্পরীতি নকল হওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে ইরানের পুলিশও বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নেয় এবং একটি সমন্বিত তদন্ত শুরু হয়।
দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর কয়েকজন পুরাকীর্তি পাচারকারী গ্রেফতার হয়। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য—এই প্রত্নবস্তুগুলো ইরানের তেহরান, বন্দর আব্বাস ও কের্মান শহর হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হচ্ছিল। আরও জেরার পর জানা যায়, দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের কের্মান প্রদেশের এক দুর্গম এলাকা—জিরফট অঞ্চলের প্রায় ২৫ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত হালিল নদীর উপত্যকা থেকেই এসব বিস্ময়কর নিদর্শন সংগ্রহ করা হয়েছে।
এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই সবাই অবাক হয়ে যান। কারণ, সেই অঞ্চল সম্পর্কে তখন পর্যন্ত কোনো উন্নত প্রাচীন সভ্যতার অস্তিত্বের কথা জানা ছিল না।
আসলে এই আবিষ্কারের পেছনে ছিল প্রকৃতির এক ভয়াবহ ঘটনা। ২০০১ সালে হালিল নদীতে ঘটে ভয়ংকর বন্যা। নদীর জল আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করে ফেলে। বন্যা শেষে যখন জল ধীরে ধীরে সরে যায়, তখন উপরের মাটির স্তর ধুয়ে চলে যায়। আর ঠিক তখনই উন্মোচিত হয় একটি প্রাচীন সমাধিক্ষেত্র এবং অসংখ্য মূল্যবান প্রত্নবস্তু।
স্থানীয় মানুষজন এসব বস্তু দেখামাত্রই বুঝে গিয়েছিল—এগুলো সাধারণ কিছু নয়। এলাকার দরিদ্র মানুষদের কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু চক্র মাটি খুঁড়ে প্রত্নবস্তু সংগ্রহ শুরু করে এবং সেগুলো পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো এলাকা ব্যাপক লুটপাটের শিকার হয়।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ইরানের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ দ্রুত হস্তক্ষেপ করে। আনুষ্ঠানিকভাবে খননকাজ শুরু হয় এবং খুব শিগগিরই প্রত্নতত্ত্ববিদরা নিশ্চিত হন—এই সভ্যতার বয়স প্রায় ৫০০০ বছর। এটি ছিল ব্রোঞ্জ যুগের এক অত্যন্ত উন্নত ও সমৃদ্ধ সভ্যতা। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দুই বছর ধরে চলা অনিয়ন্ত্রিত খনন ও লুটপাটের ফলে প্রত্নস্থলটির বড় অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
তবুও গবেষকরা হাল ছাড়েননি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাইরের অংশ সংরক্ষণ ও অধ্যয়নের আওতায় আনা হয়। ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের খ্যাতনামা প্রত্নতত্ত্ববিদ ইউসুফ মাদজিদজাদেহের নেতৃত্বে শুরু হয় পরিকল্পিত খনন অভিযান।
এই অভিযানে প্রথম যে বড় আবিষ্কারটি হয়, তা হলো একটি বিশাল নেক্রোপলিস বা সমাধিক্ষেত্র, যার নাম দেওয়া হয় মাহতুতাবাদ। যদিও এখান থেকে বহু মূল্যবান সম্পদ আগেই লুট হয়ে গিয়েছিল, তবুও এই স্থান থেকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী প্রত্নবস্তু উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
সমাধিক্ষেত্রের কাছাকাছি দুটি বিশাল ঢিবির সন্ধান পাওয়া যায়। ঢিবি দুটি পরস্পর থেকে প্রায় এক মাইল দূরে অবস্থিত। এগুলোর নাম রাখা হয় দক্ষিণ কোনার স্যান্ডাল এবং উত্তর কোনার স্যান্ডাল। উত্তর দিকের ঢিবিটি ছিল একটি উপাসনালয়, আর দক্ষিণ দিকের ঢিবিটি ছিল একটি সুরক্ষিত দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। দুর্গটি ইটের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল এবং এর ভেতরে একাধিক কক্ষের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। কার্বন ডেটিংয়ের মাধ্যমে জানা যায়, এই স্থাপনাগুলো খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ থেকে ২২০০ সালের মধ্যে নির্মিত।
প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, জিরফট অঞ্চলটি খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম সহস্রাব্দেই একটি সমৃদ্ধ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে এসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে, যার প্রাণকেন্দ্র ছিল হালিল নদীর উপত্যকা। এখানে গড়ে উঠেছিল বিস্তীর্ণ বসতি, শিল্পপল্লী ও আবাসিক এলাকা।
জিরফটের কারিগররা লাপিজ লাজুলি, ক্লোরাইট, ক্যালসাইট ও অবসিডিয়ান পাথরে অসাধারণ খোদাই কাজ করত। এই প্রত্নবস্তুগুলো দেখে গবেষকরা মনে করেন, জিরফট সভ্যতার সঙ্গে মেসোপোটেমীয় ও হরপ্পা সভ্যতার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।
২০০৭ সালে খননের প্রথম পর্যায় শেষ হয়। এরপর প্রায় সাত বছর গবেষণা বন্ধ থাকে। ২০১৪ সালে দ্বিতীয় পর্যায়ের খননে আবারও রোমাঞ্চকর তথ্য সামনে আসে। এবার এমন সব শিল্পকর্ম উদ্ধার হয়, যেখানে ঐশ্বরিক শক্তির প্রভাবে ঘটে যাওয়া মহাপ্রলয়ঙ্করী বন্যার মিথিক্যাল কাহিনি চিত্রিত হয়েছে—যা সুমেরীয় ও ব্যাবিলনীয় বন্যা-কাহিনির সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়।
জিরফটের প্রত্নবস্তুতে পাওয়া বিছামানব ও ষাঁড়মানবের চিত্র গিলগামেশ মহাকাব্যের চরিত্রগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। বিশেষ করে বিছামানবদের মৃতদের দরজার প্রহরী হিসেবে দেখানোর ধারণা সুমেরীয় বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি।
এছাড়াও খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে নির্মিত একটি ফুলদানিসহ বহু প্রত্নবস্তুতে পাওয়া যায় রাজা ইটানা, ঈগল ও সাপের বিখ্যাত মিথিক্যাল কাহিনি। এই গল্প সুমেরীয় রাজাদের তালিকায় উল্লেখিত এবং জিরফটের শিল্পে এর উপস্থিতি গবেষকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
অনেক গবেষকের মতে, জিরফট সভ্যতা মেসোপোটেমিয়ারও আগে বিকশিত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে মেসোপোটেমীয় সভ্যতা জিরফটের শিল্প ও সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়। এখানে পাওয়া ট্যাবলেটগুলোতে দুটি ভিন্ন লিখনপদ্ধতির প্রমাণ মিলেছে—একটি এলামীয় ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত, অন্যটি সম্পূর্ণ অজানা এক জ্যামিতিক লিপি।
‘জিরফট’ নামটি আধুনিক প্রত্নতত্ত্ববিদদের দেওয়া। এই সভ্যতার প্রকৃত নাম আজও অজানা। তবে ইউসুফ মাদজিদজাদেহ মনে করেন, এটি সুমেরীয় সাহিত্যে বর্ণিত সম্পদশালী কিংবদন্তির নগরী ‘আরাত্তা’ হতে পারে। আবার কেউ কেউ একে প্রাচীন মারহাশি রাজ্যের অংশ বলেও ধারণা করেন।
নিঃসন্দেহে, জিরফট আবিষ্কার মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে থাকা শুষ্ক বালুর নিচে যে এখনও এমন বিস্ময়কর সভ্যতার স্মৃতি লুকিয়ে থাকতে পারে—জিরফট তার জ্বলন্ত প্রমাণ। কে জানে, ভবিষ্যতে হয়তো আরও কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসবে মানবসভ্যতার এমনই আরেকটি বিস্মৃত সভ্যতার গল্প, যা আমাদের অতীতকে নতুন করে চিনতে সাহায্য করবে।