সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
“যত দ্রুত সম্ভব গরীবরা টাকা পান, সেটাই উদ্দেশ্য আদালতের। যারা মনরেগায় কাজ করেন তাঁরা গরিব। তাই টাকার ব্যবস্থা করাই আমাদের লক্ষ্য।” কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও বাংলার ১০০ দিনের কাজের শ্রমিকদের বকেয়া টাকা না মেটানোর প্রেক্ষিতে আজ কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্যে নিজের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট ভাষায় এমন কথা জানিয়ে দিলেন কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল। গত কয়েক বছর ধরেই মনরেগা প্রকল্পে বাংলার যে সমস্ত গরীব মানুষ কাজ করেছেন তাদের মজুরির টাকা বকে রেখে দিয়েছে কেন্দ্রের ভারতীয় জনতা পার্টি শাসিত সরকার। মুখ্যমন্ত্রী নিজে একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে চিঠি দিয়ে এবং দেখা করে বাংলার শ্রমিকদের ১০০ দিনের কাজের টাকা মিটিয়ে দেওয়ার আবেদন জানালেও তাতে কর্ণপাত করেনি কেন্দ্রীয় সরকার।
পরবর্তীকালে কলকাতা হাইকোর্টের দায়ের হওয়া জনস্বার্থে মামলার প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট স্পষ্ট ভাষায় কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিল অবিলম্বে বাংলায় ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে যে সমস্ত শ্রমিকের টাকা বাকি রয়েছে তাদের টাকা মেটানোর পাশাপাশি বাংলায় ১০০ দিনের প্রকল্পের কাজ শুরু করতে হবে। কিন্তু তারপরেও বাংলায় ১০০ দিনের প্রকল্পে কাজ শুরু করা তো দূরের কথা এখনো পর্যন্ত গত কয়েক বছর ধরে বকেয়া পড়ে থাকা বিপুল অংকের টাকা মেটানোর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি কেন্দ্রীয় সরকার। কখনো হাইকোর্টে আবার কখনো আবার সুপ্রিম কোর্টের ছুটে গিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার বারেবারে দাবী করেছে বাংলায় নাকি ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে টাকা নয় ছয় হয়েছে। তার প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট এবং কলকাতা হাইকোর্ট বারে বারে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন দুর্নীতির অভিযোগ যদি থাকে তার তদন্ত প্রক্রিয়া চলতে থাকবে কিন্তু বকেয়া টাকা মিটিয়ে দিতে হবে। তারপরেও আজ আবার কেন্দ্রের তরফে ডেপুটি সলিসিটর জেনারেল দাবি করেন ডিভিশন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ ছিল, দুর্নীতি হয়েছে। দোষীদের শাস্তি ও তদন্ত চালাতে হবে। আর গোটা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত রাজ্য সেটা প্রমাণিত। তাই রাজ্যের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে রাজ্যের তরফে আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কেন্দ্র যাই অভিযোগ করুক সবার আগে, টাকা দিতে হবে। প্রসঙ্গত, এর আগেও সুপ্রিম কোর্ট আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছে, বকেয়া টাকা কেন্দ্রকে মেটাতে হবে।
একুশের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় ক্ষমতায় আসতে না পারার পর থেকে কেন্দ্রের ভারতীয় জনতা পার্টি শাসিত সরকার বাংলার প্রতি রাজনৈতিক প্রতিহিংসাববশত ১০০ দিনের কাজের টাকা আটকে দিয়েছে বলে বারে বারে অভিযোগ করেছেন মমতা। বাংলার বকেয়া টাকা মেটানোর দাবিতে দায়ের হওয়া মামলার প্রেক্ষিতে বাংলায় অবিলম্বে বন্ধ থাকা ১০০ দিনের প্রকল্প চালু করতে গতবছর জুন মাসে কেন্দ্রকে নির্দেশ দেয় কলকাতা হাইকোর্ট। কেন্দ্রীয় সরকারকে অবিলম্বে বকেয়া টাকা মেটানোর পাশাপাশি ১০০ দিনের প্রকল্প চালু করার নির্দেশ দিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্যে তীব্র ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন, কোনও কেন্দ্রীয় প্রকল্প অনন্তকালের জন্য ঠান্ডা ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া যায় না। এই রায়ের বিরোধিতা করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় সরকারের আবেদনের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টে মামলাটি ওঠে বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চে। শুনানি শেষে ১০০ দিনের টাকা দেওয়া নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের রায়কে বহাল রাখে সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ।

আজ রাজ্য সরকারের পক্ষে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন, আমরা সবাই চাই টাকা পৌঁছে যাক শ্রমিকদের হাতে। যারা মনরেগায় কাজ করেন তাঁরা গরিব। তাই টাকার ব্যবস্থা করাই আমাদের লক্ষ্য।
আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে।