সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
‘আজ সকালে কামাখ্যার পবিত্র ভূমিতে ছিলাম, আর এখন বাবা মহাদেবের পবিত্র ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছি। বাংলায় এবার আসল পরিবর্তন চাই। সকলের এটাই আশা। জঙ্গলরাজের বদল চাইছে বাংলার মানুষ।’ এভাবেই হুগলির সিঙ্গুর থেকে বাংলায় আগামী ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সরকার পরিবর্তনের ডাক দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই সিঙ্গুর! প্রায় বছর কুড়ি আগে ২০০৬ সালে বাংলায় তৎকালীন সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারের আহবানে টাটা গোষ্ঠী যেখানে ন্যানো গাড়ির কারখানা করার উদ্যোগ নিয়েছিল কিন্তু তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র আন্দোলনের সামনে পড়ে বাংলা থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয় আর কি অদ্ভুত সমাপন বাংলার তৎকালীন বিরোধী দলনেত্রী মমতার আন্দোলনে বাংলা থেকে সরে গিয়ে গাড়ির কারখানা তৈরি করেছিলেন গুজরাতের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আহ্বানে। রবিবার সিঙ্গুরের জনসভা থেকে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘বিহারে জঙ্গলরাজের অবসান হয়েছে। এবার পালা পশ্চিমবঙ্গের। টিএমসির মহা জঙ্গলরাজ বিদায় করতে রাজ্যের মানুষ তৈরি। ‘পালটানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার’-স্লোগানে সিঙ্গুর মাতালেন প্রধানমন্ত্রী।
সভায় প্রধানমন্ত্রী বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উল্লেখও করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলার মাটি স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে। বিজেপি সেই চিন্তা-ভাবনাকে দেশের প্রতি কোণে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছে। বাংলার দুর্গাপুজো ইউনেস্কো কালচারাল হেরিটেজের স্বীকৃতি পেয়েছে আমাদের সরকারের উদ্যোগে। বাংলা ভাষাকে ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা দেওয়াও বিজেপি সরকারের কাজ।’
শিল্প ও কৃষির প্রসঙ্গেও মোদী বলেন, ‘বাংলার কৃষকরা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পাবে এটাই আমার স্বপ্ন। বাংলায় হারিয়ে যাওয়া পাটশিল্প, ধনিয়াখালির তাঁতশিল্প এবং হুগলির আলু-পিয়াজ রপ্তানির ক্ষেত্রে এক নতুন দিশা দেখাবে বিজেপি সরকার।’ বাংলার আইন শৃঙ্খলার অবনতির কথা তুলে মোদী বলেন, ‘বাংলায় শিল্প ও বিনিয়োগ তখনই আসবে যখন এখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। বর্তমানে দাঙ্গাকারী ও মাফিয়ারা এই ভূমিকে নিজেদের পূণ্যভূমি হিসেবে ব্যবহার করছে। দেশের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিয়েও তৃণমূল সরকার দায়িত্বে উদাসীন।’ প্রধানমন্ত্রী সিঙ্গুরের সভা থেকে বলেন, ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, স্বামী বিবেকানন্দের জন্মজয়ন্তীকে জাতীয় স্তরে পালন করার উদ্যোগও নিয়েছে আমাদের সরকার। বিজেপি বিকাশ এবং ঐতিহ্য উভয়কেই গুরুত্ব দেয়। এই দুইয়ের মডেলেই বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের বিকাশে গতি দেবে। এই রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা ঠিক হলে তবেই বিনিয়োগ আসবে। কিন্তু এখানে মাফিয়াদের ছাড় দিয়ে রাখা হয়েছে। বাংলা ভাষাকে ধ্রুপদী ভাষার স্বীকৃতিও আমাদের সরকারের আমলেই হয়েছে। বিজেপি দিল্লিতে সরকার গঠনের পরই তা হয়েছে। তার ফলে বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণায় আরও গতি আসবে। বিজেপি সরকারের উদ্যোগেই দুর্গাপুজোকে ইউনেস্কো কালচারাল হেরিটেজের স্বীকৃতি দিয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, ‘বাংলার যুবসমাজ সুশিক্ষা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’ মোদীর মুখে এদিন উঠে আসে সন্দেশখালি প্রসঙ্গ। পাশাপাশি চাকরি দুর্নীতি ইস্যুতেও তৃণমূলকে কোনঠাসা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বিজেপির সরকার ক্ষমতায় এলে বাংলায় শিল্প এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে, কিন্তু তার জন্য দরকার আইনের শাসন ও স্বচ্ছ্ব প্রশাসন।’

বাংলার ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়ার আবহে অনুপ্রবেশ ইস্যুতে মোদী সরাসরি মমতা সরকারকে নিশানা করেন। তিনি বলেন, ‘অনুপ্রবেশকারীরাই তৃণমূলের আসল ভোটব্যাঙ্ক। বারবার জমির জন্য ফেন্সিং সংক্রান্ত আবেদন জানানো হলেও তৃণমূল সরকার জমি দেয়নি।’ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ত্রুটিও তুলে ধরেন মোদী। তিনি বলেন, ‘পিএমশ্রী স্কুলের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বাংলার শিশুদের বঞ্চিত করছে তৃণমূল সরকার। বাংলার গরীব মানুষ চিকিৎসা পরিষেবা থেকে বঞ্চিত।’ মোদী এদিনের সভা থেকে জোর দিয়ে বলেন, ‘বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে বাংলার প্রতিটি জেলার মানুষের জীবনযাত্রা উন্নত হবে। শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সব ক্ষেত্রেই উন্নয়ন হবে। বাংলার মানুষ এবার প্রকৃত পরিবর্তন চাইছে।’