আখের আঁশ থেকে ফুটে উঠেছে দেবীর মুখ – মাত্র ২ সেন্টিমিটারের দুর্গা মূর্তি গড়লেন শিল্পী দেবপ্রসাদ মালাকার। দুর্গাপুজোর আগে এই অনন্য সৃষ্টিতে ফের তাক লাগালেন ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের পলতা শান্তিনগরের বাসিন্দা। তাঁর সৃজনশীলতা প্রমাণ করে দিল, অপ্রয়োজনীয় জিনিসও শিল্পীর হাতে হয়ে উঠতে পারে অমূল্য সম্পদ।
শিল্পী দেবপ্রসাদ মালাকারের ডাক নাম রাসু। তিনি আর্ট কলেজের প্রাক্তন ছাত্র এবং গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষুদ্র মূর্তি বা মিনিয়েচার তৈরিই তাঁর সাধনা। ২০০০ সালে প্রথমবার মাটি দিয়ে ছোট্ট একটি মূর্তি গড়েছিলেন। সেই শুরু। তারপর থেকে কখনও কচুরিপানা, কখনও চক, আবার কখনও রবারের মতো সাধারণ উপাদান ব্যবহার করে তৈরি করেছেন অসংখ্য ক্ষুদ্র দুর্গা প্রতিমা। প্রতিবারই তাঁর কাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছেন শিল্পপ্রেমীরা।
তবে এবারের সৃষ্টি একেবারেই ভিন্ন। নিজের বাড়ির বাগানের আখ থেকে রস বের করে যে ছিবড়া বাকি থাকে, সেখান থেকে আঁশ আলাদা করে তৈরি করেছেন ২ সেন্টিমিটারের ক্ষুদ্রতম দুর্গা মূর্তি। এত ছোট মূর্তি বানানো সহজ নয়। প্রতিটি অংশ সূক্ষ্মভাবে তৈরি করতে লাগে প্রচুর ধৈর্য, দক্ষতা এবং মনোযোগ। শিল্পীর কথায়, “মিনিয়েচারের প্রতি ভালোবাসাই আমাকে প্রতি বছর নতুন কিছু করতে উদ্বুদ্ধ করে। আসলে এই মিনিয়েচার তৈরি করা প্রত্যেক শিল্পীর কাছেই চ্য়ালেঞ্জ। কারণ যে কোনও মিনিয়েচার তৈরির জন্য বাড়তি মনোযোগ ও দক্ষতা দরকার।”
শিল্পী ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন তাঁর অভিনব শিল্পকর্মের জন্য। কিন্তু শুধুমাত্র পুরস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন তিনি। পরিবারের সঙ্গে বড় প্রতিমা গড়ার পাশাপাশি ক্ষুদ্র মূর্তি তৈরির প্রতি তাঁর নিবেদন অটুট। এবারের আখের আঁশ দিয়ে বানানো দুর্গা মূর্তি সেই নিবেদনেরই প্রতিফলন।
এই বিশেষ সৃষ্টির মধ্যে লুকিয়ে আছে এক গভীর বার্তা। দেবপ্রসাদ মালাকার নিজেই বলেন, “এক টুকরো আঁশ বা অপ্রয়োজনীয় জিনিসও শিল্পীর হাতে সৃষ্টির উপকরণ হতে পারে। বছরের পর বছর মিনিয়েচারের প্রতি এই অগাধ ভালোবাসা বেঁচে থাকুক আমার।” তাঁর কথায় প্রতিফলিত হয় সেই শিল্পসাধনা, যা প্রতিনিয়ত তাঁকে নতুন নতুন পথ দেখাচ্ছে।
শুধু স্থানীয় নয়, রাজ্যের বাইরে থেকেও অনেকেই তাঁর কাজের ভক্ত। ক্ষুদ্র দুর্গা প্রতিমার ছবিগুলি ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে পড়েছে। মানুষ অবাক হচ্ছেন, এত ছোট মূর্তির মধ্যে কীভাবে ফুটে উঠেছে দেবীর মুখ! এই প্রতিভা শুধু পলতার নয়, গোটা বাংলার গর্ব।
দেবপ্রসাদবাবুর ইচ্ছে আগামী দিনে প্রদর্শনীর মাধ্যমে তাঁর এই সৃষ্টিগুলি আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তিনি বিশ্বাস করেন, শিল্প শুধু সৌন্দর্য নয়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ দেয়। আখের আঁশ থেকে গড়া দুর্গা মূর্তি সেই বিশ্বাসেরই প্রতীক।
দুর্গাপুজোর আগে এই ক্ষুদ্র প্রতিমা সাধারণ মানুষের কাছে এক নতুন আলোড়ন তুলেছে। শিল্পীর হাতে আখের আঁশ যেন হয়ে উঠেছে দেবীর আশীর্বাদের প্রতিচ্ছবি। দেবপ্রসাদ মালাকারের এই অনন্য সৃষ্টি প্রমাণ করল, সৃজনশীলতার কোনো সীমা নেই – ইচ্ছা আর ভালোবাসা থাকলেই প্রতিটি অপ্রয়োজনীয় জিনিসও হয়ে উঠতে পারে শিল্পের সোনালি অধ্যায়।