প্রিয়াঙ্কা মান্না। কলকাতা সারাদিন।
ভালবাসার মরসুমে সম্পর্ক, প্রতিশ্রুতি আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন—সব মিলিয়ে আবেগের ঘনঘটা থাকেই। কিন্তু সেই আবেগের মধ্যেই হঠাৎ এক মামলার শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিল দেশের শীর্ষ আদালত। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্কের অভিযোগ ঘিরে শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানাল, বিয়ের আগে সম্পর্কে জড়ানোর ক্ষেত্রে চরম সতর্ক থাকা জরুরি।
সোমবার বিচারপতি বিভি নাগরত্ন এবং বিচারপতি উজ্জ্বল ভুইঞাঁর বেঞ্চে একটি ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলার শুনানি চলছিল। অভিযোগ, এক ব্যক্তি বিয়ের আশ্বাস দিয়ে এক মহিলার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়ান। পরে সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়। এই প্রেক্ষিতেই আদালতের মৌখিক পর্যবেক্ষণ সামনে আসে।
বিচারপতি নাগরত্ন খোলাখুলি বলেন, “হয়তো আমরা একটু সেকেলে… কিন্তু বিয়ের আগে ছেলে-মেয়ে তো আসলে অপরিচিতই থাকে। সম্পর্ক যত গভীরই হোক, বিয়ের আগে কীভাবে শারীরিক সম্পর্কে জড়ানো যায়, তা আমরা বুঝতে পারি না।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল সতর্কতার সুর। তিনি আরও যোগ করেন, বিয়ের আগে কাউকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করার আগে ভেবে দেখা উচিত। আবেগের বশে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক সময় ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি করতে পারে।
মামলার সূত্রপাত ২০২২ সালে। অভিযোগকারিণী ও অভিযুক্তের আলাপ হয় একটি ম্যাট্রিমোনিয়াল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। কথাবার্তা বাড়তে বাড়তে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। অভিযোগকারিণীর দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তি তাঁকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেন এবং সেই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই তাঁদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এমনকি সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে দু’জন দুবাইতেও দেখা করেন।
কিন্তু পরে পরিস্থিতি ঘুরে যায়। অভিযোগ ওঠে, ওই ব্যক্তি আগে থেকেই বিবাহিত ছিলেন। শুধু তাই নয়, গত বছর জানুয়ারিতে পাঞ্জাবে তিনি আরও একটি বিয়ে করেন বলেও জানা যায়। বিষয়টি জানার পরই অভিযোগকারিণী আইনের দ্বারস্থ হন। তাঁর আরও দাবি, তাঁদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও তাঁর অজান্তে রেকর্ড করা হয়েছিল এবং তা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এই অভিযোগ মামলাটিকে আরও গুরুতর করে তোলে।
শুনানির সময় বিচারপতি নাগরত্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন। যদি বিয়ে নিয়ে এতটাই দৃঢ়তা থাকে, তাহলে বিয়ের আগে দুবাই সফরের সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল? সরকারি কৌঁসুলি জানান, দু’জনই বিয়ের পরিকল্পনা করছিলেন এবং সেই সূত্রেই সফর। তবে বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করে জানায়, যদি কারও মানসিকতা রক্ষণশীল হয় এবং বিয়েকেই সম্পর্কের চূড়ান্ত স্বীকৃতি বলে মনে করা হয়, তাহলে বিয়ের আগে এমন ভ্রমণ বা ঘনিষ্ঠতায় জড়ানো উচিত কি না, তা ভেবে দেখা দরকার।
আদালত এ-ও স্পষ্ট করে দেয়, সম্মতিসূচক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সব সময় ফৌজদারি মামলা ও দণ্ডই একমাত্র সমাধান নয়। অনেক সময় সম্পর্কের ভাঙন, ভুল বোঝাবুঝি বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিষয়গুলি জটিল মানসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠে। তাই প্রতিটি ঘটনাকে এক ছাঁচে ফেলা ঠিক নয়। বেঞ্চ জানায়, এই ধরনের বিষয়ে মধ্যস্থতার পথও বিবেচনা করা যেতে পারে, যাতে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা যায় এবং আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি সমাধানের অন্য উপায়ও খোঁজা সম্ভব হয়।
এই পর্যবেক্ষণ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। একাংশ মনে করছেন, আদালতের মন্তব্য সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। আবার অন্য অংশের মতে, প্রাপ্তবয়স্ক দু’জন মানুষের সম্মতিসূচক সম্পর্ককে শুধুমাত্র নৈতিকতার মানদণ্ডে বিচার করা উচিত নয়। তবে আদালতের বক্তব্যে মূল সুর ছিল সতর্কতার—বিশেষ করে যখন বিয়ের প্রতিশ্রুতি, বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে।

বর্তমান সময়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পরিচয়, দ্রুত ঘনিষ্ঠতা এবং দূরত্ব পেরিয়ে সম্পর্ক গড়ে ওঠা খুবই সাধারণ ঘটনা। কিন্তু সেই সম্পর্কের ভিত কতটা মজবুত, প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তব—তা যাচাই না করে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এই মামলাটি সেই ঝুঁকির দিকটাই সামনে আনল।
মামলাটি পরবর্তী শুনানির জন্য বুধবার তালিকাভুক্ত হয়েছে। আদালতের চূড়ান্ত রায় যা-ই হোক, এই শুনানির পর্যবেক্ষণ অনেককেই ভাবতে বাধ্য করেছে—বিশ্বাস, ভালবাসা আর আইনের সীমারেখা ঠিক কোথায় টানা উচিত?