শৌভিক তালুকদার। কলকাতা সারাদিন।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা Ali Khamenei–এর মৃত্যুর খবর সামনে আসতেই থমথমে গোটা দেশ। কোথাও কান্না, কোথাও শোকমিছিল, আবার কোথাও উল্টো চিত্র—উদযাপনের ছবি। এই দ্বিধাবিভক্ত আবহেই আন্তর্জাতিক দৃষ্টি গিয়ে স্থির হয়েছে কোম শহরের ঐতিহাসিক Jamkaran Mosque–এর গম্বুজের চূড়ায়। সেখানে উড়ছে একটি লাল পতাকা।
শুধু একটি পতাকা নয়, এই লাল রঙের মধ্যে লুকিয়ে আছে গভীর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বার্তা। শিয়া মুসলিম সমাজে লাল পতাকা সাধারণত শহিদত্ব এবং প্রতিশোধের প্রতীক। অর্থাৎ রক্তের ঋণ এখনও শোধ হয়নি—এই বার্তাই তুলে ধরে এই রীতি। তাই আয়াতোল্লার মৃত্যুর পর জামকারান মসজিদের মাথায় লাল পতাকা ওঠা নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এক সুস্পষ্ট সংকেত।
জামকারান মসজিদ শুধু ইরানের নয়, সারা বিশ্বের শিয়া মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থান। সেখানে যা ঘটে, তা আন্তর্জাতিক মহলেও গভীরভাবে পর্যবেক্ষিত হয়। ফলে এমন সংবেদনশীল সময়ে এই পতাকা উত্তোলন নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও ইরানের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, তবু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এটি সমর্থকদের উদ্দেশে এক আবেগঘন বার্তা—ন্যায়বিচার চাই, এবং প্রয়োজনে প্রতিশোধও।
এই ঘটনাপ্রবাহের পটভূমিতে রয়েছে তীব্র ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দাবি, আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের সাম্প্রতিক হামলার পর ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টা আঘাত হেনেছে। বিশেষ করে যেখানে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি রয়েছে, সেসব এলাকায় হামলার খবর মিলেছে। ওমান উপকূলে একটি তেলের ট্যাঙ্কারেও আক্রমণের অভিযোগ উঠেছে। ওই জাহাজে ১৫ জন ভারতীয় ও পাঁচ জন ইরানীয় নাগরিক ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। ওমানের একটি বন্দরে ড্রোন হামলার কথাও সামনে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে পশ্চিম এশিয়ায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ইতিমধ্যেই ইরানকে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলির অনেকেই জানিয়েছে, তারা ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চায় না। কারণ এই অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের অভ্যন্তরে চিত্র আরও জটিল। আয়াতোল্লা খামেনেই ছিলেন একাধারে ধর্মীয় পথপ্রদর্শক এবং রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর দীর্ঘ শাসনকালে তিনি যেমন অগণিত সমর্থক তৈরি করেছেন, তেমনই তীব্র সমালোচনার মুখেও পড়েছেন। তাঁর মৃত্যুর পর সেই বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ শোকপ্রকাশ করছেন, আবার সামাজিক মাধ্যমে ও কিছু এলাকায় উল্লাসের ছবিও ভেসে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে লাল পতাকা যেন ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর এক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান স্পষ্ট করে দিল। এটি একদিকে ধর্মীয় প্রতীক, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংকেত। বার্তা একটাই—ইরান দুর্বল নয়, এবং তারা নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসছে না।

এখন প্রশ্ন, সামনে কী? নেতৃত্বের পরিবর্তন কীভাবে সামাল দেবে তেহরান? আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মধ্যে নতুন অধ্যায় কীভাবে রচিত হবে? আপাতত বিশ্বের নজর কোম শহরের দিকে। জামকারান মসজিদের চূড়ায় উড়তে থাকা সেই লাল পতাকা শুধু শোকের নয়, সম্ভাব্য সংঘাতেরও পূর্বাভাস দিচ্ছে।

পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিতে প্রতীক অনেক সময় বাস্তব ঘটনার আগাম ইঙ্গিত দেয়। সেই দিক থেকে দেখলে, এই পতাকা উত্তোলন নিছক ধর্মীয় রীতি নয়—বরং এক রাজনৈতিক ঘোষণা। আগামী দিনগুলোই বলে দেবে, তা কূটনৈতিক আলোচনায় থামবে, না কি আরও বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নেবে।