সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে আবারও মৃত্যুর মর্মান্তিক খবর। এবার ঘটনাস্থল কর্ণাটকের রাজধানী Bengaluru। অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘিরে উঠছে একের পর এক প্রশ্ন। পরিবারগুলির অভিযোগ, কেবলমাত্র বাঙালি পরিচয়ের কারণেই তাঁদের টার্গেট করা হয়েছে। যদিও প্রশাসনের তরফে এখনো পর্যন্ত কোনও নির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি, ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে সবাই।
প্রথম ঘটনায় মৃত পুরুলিয়ার ঝালদা দু’নম্বর ব্লকের খৈরি গ্রামের বাসিন্দা অনাদি মাহাতো। পরিবারের দাবি, সোমবার রাত ১১টা নাগাদ স্ত্রী প্রীতিলতার সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা কথা হয় তাঁর। তিন বছরের ছেলে ও ছয় বছরের মেয়ের সঙ্গে ভিডিও কলে হাসিমুখেই কথা বলেন অনাদি। প্রতিদিনের মতো ভোরে কাজে বেরোনোর কথা ছিল। কিন্তু মঙ্গলবার ভোরে ফোন না আসায় সন্দেহ জাগে পরিবারের মনে। সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেই জানা যায়, অনাদি অসুস্থ। কিছুক্ষণের মধ্যেই আসে মৃত্যুসংবাদ।
পরিবারের অভিযোগ, দেহ উদ্ধারের পর দীর্ঘ সময় ময়নাতদন্ত না হওয়ায় তাঁদের সন্দেহ আরও গভীর হয়। স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের মাধ্যমে বিষয়টি পৌঁছয় দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক Abhishek Banerjee-র কাছে। তাঁর হস্তক্ষেপেই বেঙ্গালুরুতে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে বিমানে দেহ ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এই ঘটনায় রাজনৈতিক মাত্রাও যুক্ত হয়েছে স্বাভাবিকভাবেই।
দ্বিতীয় ঘটনাটি বীরভূমের দুবরাজপুরের বাসিন্দা গৌরসুন্দর হাজরাকে ঘিরে। তিনি বেঙ্গালুরুর একটি বেসরকারি সংস্থায় নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করতেন। মঙ্গলবার ভোরে সহকর্মীরা তাঁকে সংস্থার মেস থেকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করেন। হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। পরিবারের দাবি, গৌরসুন্দরের কোনও দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক সমস্যা ছিল না। সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষ হঠাৎ এভাবে চলে যেতে পারেন—এ কথা তাঁরা মানতে পারছেন না।
গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাঙালি পরিযায়ীদের উপর নিগ্রহের অভিযোগ সামনে এসেছে। বাংলায় কথা বলা বা পরিচয় জানাজানি হওয়ায় হেনস্তার কথাও শোনা গিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে এই দুই মৃত্যুকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই উত্তেজনা বাড়ছে। পরিবারগুলির বক্তব্য, এটি নিছক অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা নয়; এর নেপথ্যে অন্য কারণ খতিয়ে দেখা দরকার।
রাজনৈতিক মহলও বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছে। কারণ, ভিন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া লক্ষাধিক শ্রমিকের নিরাপত্তা এখন বড় প্রশ্নচিহ্নের সামনে। অর্থনৈতিক প্রয়োজনে বাড়ি ছেড়ে দূরে পাড়ি জমানো এই মানুষগুলির সুরক্ষা নিশ্চিত করা কি সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির দায়িত্ব নয়? পাশাপাশি, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর দাবি উঠছে।

দুই পরিবারের চোখ এখন ময়নাতদন্তের রিপোর্টের দিকে। সত্যিই কি এটি স্বাভাবিক মৃত্যু, নাকি অন্য কোনও অন্ধকার দিক রয়েছে? উত্তর মিললেই স্পষ্ট হবে ঘটনার প্রকৃত চিত্র। তবে এই দুই মৃত্যুর পর আবারও সামনে চলে এসেছে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন—যা কেবল প্রশাসনিক নয়, মানবিক দায়িত্বেরও পরীক্ষা।