উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক ঘটনা। একজন তরুণী গৃহবধূ অভিযোগ তুলেছেন, স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা তাঁকে নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছেন। কারণ একটাই—স্বামী চেয়েছিলেন স্ত্রী যেন বলিউড অভিনেত্রী নোরা ফতেহির মতো শরীরের আকৃতি পান।
২৬ বছরের ওই তরুণীর অভিযোগ, বিয়ের কয়েক সপ্তাহ পরেই তাঁর জীবনে দুঃস্বপ্ন নেমে আসে। স্বামী শিবম, যিনি পেশায় একটি সরকারি স্কুলের ফিজিক্যাল এডুকেশন শিক্ষক, প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁকে শরীরচর্চা করতে বাধ্য করতেন। এমনকি শরীরচর্চা কম হলে বা বাদ দিলে খাবার খেতেও দেওয়া হতো না।
নোরা ফতেহির মতো শরীরের জন্য চাপ
গৃহবধূ সানুর দাবি, তাঁর স্বামীর সবচেয়ে প্রিয় অভিনেত্রী নোরা ফতেহি। তাই বিয়ের পর থেকেই স্বামী চাইতেন, সানু যেন নোরার মতো সরু কোমর ও লাস্যময়ী ফিগার পান। দিনে অন্তত তিন ঘণ্টা করে শরীরচর্চা করার জন্য জোর করতেন তিনি।
কেবল তাই নয়, সানুর গর্ভধারণের পরও শারীরিক পরিশ্রমে বাধ্য করা হতো। অভিযোগ, সরু কোমরের জন্য শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা তাঁকে ওষুধ খাইয়ে গর্ভপাত ঘটান। এমনকি কিছু খাবারের মাধ্যমেও তাঁর ভ্রুণ নষ্ট করা হয়।
মানসিক নির্যাতন ও বডি শেমিং
সানুর আরও অভিযোগ, তাঁর স্বামী প্রায়ই পর্ন ভিডিও দেখতেন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় অশ্লীল ছবি-ভিডিওতে আসক্ত ছিলেন। অন্য মহিলাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলতেন এবং একটি মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতাও করেন।
যখনই সানু এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন, তখনই অকথ্য ভাষায় গালাগালি দিতেন এবং মারধর করতেন। পরিবারের সামনেই তাঁকে অপমান করা হতো।
তিনি বলেন,
“আমি ফর্সা এবং লম্বা হওয়া সত্ত্বেও স্বামী আমার শরীর নিয়ে নিয়মিত খোঁটা দিতেন। একাধিকবার বডি শেমিংয়ের শিকার হয়েছি।”
পণ ও বিয়ের খরচ
ঘটনার আরও এক দিক প্রকাশ্যে এসেছে। জানা গেছে, সানুর পরিবার প্রায় ৭৭ লক্ষ টাকা খরচ করে এই বিয়ে সম্পন্ন করেছিল। এর মধ্যে ১৬ লক্ষ টাকার সোনার গয়না, ২৪ লক্ষ টাকার একটি গাড়ি এবং ১০ লক্ষ টাকা নগদ দেওয়া হয়েছিল শিবমের পরিবারকে।
তবুও সুখের সংসার গড়ে ওঠেনি। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই নির্যাতন শুরু হয়। শাশুড়ি তাঁকে বাইরে যেতে দিতেন না এবং সারাদিন বাড়ির কাজে ব্যস্ত রাখতেন। স্বামীর সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
ভ্রুণ নষ্ট ও অভিযোগ দায়ের
গত জুন মাসে নির্যাতনের চরম পর্যায়ে পৌঁছান সানু। তাঁর অভিযোগ, শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা তাঁকে জোর করে গর্ভপাতের ওষুধ খাইয়ে দেন। ৯ জুলাই তাঁর গর্ভপাত হয়।
অবশেষে ১৮ জুন তিনি বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন এবং ১৪ আগস্ট শিবম ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, জোরপূর্বক গর্ভপাত এবং পণ প্রথার কথা তুলে ধরেছেন।
সামাজিক বার্তা
এই ঘটনাটি কেবল গাজিয়াবাদের এক গৃহবধূর নয়, বরং সমাজের এক অন্ধকার চিত্র তুলে ধরে। মেয়েদের শরীরকে নিয়ে অবাস্তব প্রত্যাশা, বডি শেমিং, পণপ্রথা এবং মানসিক নির্যাতন এখনও দেশের বহু জায়গায় চলতে থাকে।
নোরা ফতেহি একজন জনপ্রিয় বলিউড অভিনেত্রী, যাঁর নাচ ও ফিগার নিয়ে ভক্তদের উন্মাদনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তব জীবনে প্রতিটি মানুষ আলাদা। অন্যের মতো শরীর গড়ে তোলার জন্য জোরজবরদস্তি বা নির্যাতন কোনোভাবেই মানবিক নয়।
গাজিয়াবাদের এই ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হলো, সমাজে এখনো নারীদের ওপর অত্যাচার, বডি শেমিং এবং পণের অভিশাপ বিরাজ করছে। আইনি পথে লড়াই শুরু করেছেন সানু। এই লড়াই কেবল তাঁর নয়, প্রতিটি নারীর নিরাপত্তা ও সম্মানের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।