সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘বিজেপির হাতে রাজ্য গেলে আপনার অস্তিত্ব থাকবে না, আপনার সম্মান থাকবে না, আপনার ঠিকানা থাকবে না। বাংলাটা ডিটেনশন ক্যাম্পে পরিণত হবে।’ কোচবিহার রাসমেলা ময়দান থেকে এভাবেই বাংলার মানুষকে বিজেপি এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে সতর্ক করলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এসআইআর আবহে কোচবিহারের রাসমেলা ময়দানে বড়সড় জনসভা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার সাফ কথা, ‘সামনে নির্বাচন রয়েছে। তাই সবটাই প্ল্যান করে করেছে। নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘু ভোট ভাগ করার চেষ্টা করছেন কোটি কোটি টাকা খরচ করে। এসআইআরে সবাই নাম তুলবেন। কারণ এটা ওদের চালাকি। সামনে নির্বাচন রয়েছে। তাই প্ল্যান করে করেছে। যদি আমরা না করি তাহলে ওরা রাষ্ট্রপতি শাসন করে ভোট করবে।’ কেন তিনি পুরো বিষয়ে প্ল্যান বলছেন এদিন তার ব্যখ্যাও দেন তিনি। বলেন, ‘ফাইনাল লিস্ট তৈরি করেই পরের দিন নির্বাচন ঘোষণা করে দেবে যাতে কেউ আদালতে যেতে না পারে। কোর্টের ব্যাপার আমি কোর্টের উপর ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু রাজনৈতিক লড়াই আমরা রাজনৈতিকভাবেই লড়ব।’ মমতার দাবি, বিজেপির হাতে রাজ্য গেলে বাংলাটা শেষ হয়ে যাবে। বলেন, ‘বিজেপির হাতে রাজ্য গেলে আপনার অস্তিত্ব থাকবে না, আপনার সম্মান খাকবে না, আপনার ঠিকানা থাকবে না। বাংলাটা ডিটেনশন ক্যাম্পে পরিণত হবে।’ তবে বাংলা কোনওভাবেই যে ডিটেনশন ক্যাম্প করতে দেওয়া হবে না তা ফের একবার জোর দিয়ে বলেন তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হুঙ্কার দিয়ে বলেন, ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার উত্তর প্রদেশ, অসমে ডিটেনশন ক্যাম্প চালু করেছে। কিন্তু আমরা এখানে আমরা এনআরসি করতে দেব না। কোনও ডিটেনশন ক্যাম্প হবে না।’
সকলে ভয় না-পেয়ে এসআইআর প্রক্রিয়ায় নাম তোলার কথা বলেন মমতা। তিনি বলেন, ‘আগে নোটবন্দি করেছিল। এখন এসআইআরের নামে ভোটবন্দি করার চেষ্টা। যাঁরা মারা যাননি, তাঁদের মৃত দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে। পরিযায়ী শ্রমিক সকলকে বলব নামটা তুলতে। হিয়ারিংয়ে যাবেন, সব কাগজ নিয়ে যাবেন।’ সকলকে একসঙ্গে কাজ করার কথা বলেন মমতা। তাঁর কথায়, ‘দলও যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে। মনে রাখবেন, যুদ্ধ যখন হয় তখন সকলকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে হয়।’
কাগজ ছিঁড়ে প্রতিবাদ
কোচবিহারের সভায় একশো দিনের কাজ নিয়ে কেন্দ্রের চিঠি ছিঁড়ে প্রতিবাদ করে মমতা বলেন, ‘গত পরশু দিন আমাদের একটা চিঠি দিয়েছে। তাতে শর্ত দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ত্রৈমাসিক শ্রমবাজেট দেখাতে হবে। দেখানোর সময় কোথায়? এটা ডিসেম্বর মাস। বলা হয়েছে, একটা গ্রামসভায় মাত্র ১০ জন কাজ পাবে, এটা হয় কখনও? একটা পরিবারেই তো ১০টা গরিব লোক থাকে। তার পরে বলছে ট্রেনিং দিতে হবে। বলছে জমির কাজ করা যাবে না। এই কাগজটার কোনও ভ্যালু নেই। আবার আমরা ক্ষমতায় আসব। কর্মশ্রীতে এ বার ৭৫ দিন কাজ হয়েছে। একশো দিনের কাজ বাংলাই করবে। চাই না তোমাদের ভিক্ষা। এটা আমার নোট, কেন্দ্রের কোনও অর্ডার নয়। আমি অর্ডারটা পড়ে দিলাম। এটা আমি ছিঁড়ে ফেলে দিচ্ছি। আমি মনে করি এটা অপমান, অসম্মান। একশো দিনের কাজের টাকা দেওয়া চার বছর ধরে বন্ধ করে দিয়েছে। আবাস যোজনা বন্ধ। গ্রামীণ রাস্তার কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। মনে রাখবেন ২০১১ সালের পর থেকে একশো দিনের কাজে আমরা অনেক জাতীয় পুরস্কার পেয়েছি। ভাল কাজ করা কি অপরাধ? আমাদের সাংসদেরা দিল্লিতে গিয়েছিলেন আন্দোলন করতে। কিন্তু সকলের নামে কেস দিয়েছে।’

মোদিকে আক্রমণ
সোমবার লোকসভায় বন্দে মাতরম নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তৃতায় বড় অংশ জুড়েই ছিল বাংলার কথা। সেই কথা বলতে গিয়ে বন্দে মাতরমের স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিমদা’ বলে সম্বোধন করেন। প্রায় এক ঘণ্টার বক্তৃতায় একাধিক বার বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘বঙ্কিমদা’ বলে সম্বোধন করছিলেন তিনি। বার বার বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘বঙ্কিমদা’ বলায় বিরোধী আসন থেকে প্রতিবাদ জানান দমদমের তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়। কোচবিহারের সভা থেকে মমতা বলেন, ‘বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বললেন বঙ্কিমদা। যেন মনে হচ্ছে শ্যামদা, হরিদা। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যিনি জাতীয় গান রচনা করেছিলেন, তাঁকে এইটুকু সম্মান দিলেন না! আপনাদের তো মাথা নিচু করে নাকখত দেওয়া উচিত জনগণের কাছে। তাতেও ক্ষমা হবে না। দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাসকে অসম্মান করেছেন।’
ভোট হবে উন্নয়নের নিরিখে
আগামী বছর অর্থাৎ 2026 সালের বিধানসভা নির্বাচন হবে উন্নয়নের কাজের নিরিখে বলে দাবি করে কোচবিহারের সভা থেকে বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট কেনার অভিযোগ করলেন মমতা। তিনি বলেন, ‘আমি বিজেপির মতো টাকা দিয়ে ভোট কিনি না। আমি ভালবাসা দিয়ে কিনি। তাই যা দেওয়ার ভোটের আগেই দিই। ভোটের আগে উজলার নামে নাটক, চা বাগান খোলার নাটক, নতুন করে কিছু দেওয়ার নাটক? এ সব আমরা বরদাস্ত করি না। আমরা উন্নয়ন পাঁচালি তৈরি করছি। ক্ষমতায় আসার পর এক বছর আমাকে বামফ্রন্ট সরকারের জঞ্জাল পরিষ্কার করতে সময় দিতে হয়েছে।’