সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর প্রক্রিয়াকে ঘিরে বাংলার রাজনীতিতে নতুন করে বিস্ফোরণ ঘটালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র ভবানীপুরে দাঁড়িয়ে তিনি অভিযোগ করলেন— সব মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে। তাঁর কথায়, “সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিলেও এরা চুপিচুপি ছুপা রুস্তমের মতো কাজ করছে।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মন্তব্য নিছক প্রশাসনিক সমালোচনা নয়, বরং আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে ভোটার তালিকা নিয়েই বড় রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইঙ্গিত।
৫৮ লক্ষ থেকে ১ কোটি ২০ লক্ষ— সংখ্যার অঙ্কে আতঙ্ক
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম বাদ পড়ে। এরপর ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেনসি’র অজুহাতে আরও ৮০ লক্ষ নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে অভিযোগ। এর মধ্যে প্রায় ২০ লক্ষ মৃত ভোটার ধরলেও মোট বাদ পড়া নামের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ।
মমতার প্রশ্ন, “২৮ তারিখ যখন চূড়ান্ত তালিকা বেরোবে, তখন যদি কারও নাম না থাকে, তাদের দুঃখের কথা ভাবছেন?” তাঁর দাবি, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরও কমিশনের কাজকর্মে স্বচ্ছতা নেই।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এত বড় সংখ্যায় নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা শুধু নির্বাচনী সমীকরণ নয়, গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপরও গভীর প্রভাব ফেলবে।
কমিশন-বিজেপি আঁতাতের অভিযোগ
মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি অভিযোগ করেন, কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপির সঙ্গে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের অশুভ আঁতাত রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, “আমি দেখব না কে তৃণমূল, কে সিপিএম, কে বিজেপি। কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে জৈন— আমি দেখব গণতন্ত্র যেন ধ্বংস না হয়।”
এই বক্তব্যে তিনি স্পষ্টতই বিষয়টিকে দলীয় রাজনীতির গণ্ডির বাইরে নিয়ে গিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে দাঁড় করাতে চাইছেন। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি নিজে সুপ্রিম কোর্টে লড়াই করছেন এবং মামলা এখনও বিচারাধীন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা এই ইস্যুকে মানবিকতার মোড়কে তুলে ধরে বৃহত্তর জনমত গড়ে তুলতে চাইছেন— বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক ভোটারদের মধ্যে।
ভবানীপুর থেকে বার্তা
ভবানীপুরকে ‘মিনি ইন্ডিয়া’ আখ্যা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এখানে বহু ভাষাভাষী ও বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বাস করেন। জৈন সম্প্রদায়ের আমন্ত্রণে তিনি সন্ত কুটিয়া গেট ও মান স্তম্ভের উদ্বোধন করেন। একই মঞ্চ থেকে তিনি সবুজ সাথী প্রকল্পে ১২.৫ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীকে সাইকেল বিতরণ এবং রাজ্যজুড়ে একগুচ্ছ উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করেন।
তিনি বলেন, “মানস্তম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে আমি অহংকার ত্যাগ করে সমাজসেবায় নিয়োজিত হতে চাই।” বক্তব্যের মধ্যে ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তাও ছিল স্পষ্ট— “আমরা বাংলায় সব ধর্মের সম্মান করি।”
জৈন ধর্মের সঙ্গে বাংলার ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বর্ধমান ও পুরুলিয়ার মন্দিরের প্রসঙ্গ তোলেন। ফুরফুরা শরীফে ১০০ শয্যার হাসপাতাল উদ্বোধন, আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালে ৫০ শয্যার ক্রিটিক্যাল কেয়ার ব্লক, বাঁকুড়ায় দ্বারকেশ্বর নদীর উপর নতুন সেতু— একাধিক প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন তিনি।
উন্নয়ন বনাম ভোট রাজনীতি
আজ ৮৫০ কোটি টাকার প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। ১৪টি প্রকল্পের উদ্বোধন, ১২০টি নতুন সিএনজি বাস সংযোজন, মালদায় ভূগর্ভস্থ কেবল নেটওয়ার্কের সূচনা, সল্টলেকে ৩১ কোটি টাকায় সংখ্যালঘু সংস্কৃতি কেন্দ্র— তালিকা দীর্ঘ।
রাজনৈতিকভাবে এর তাৎপর্যও কম নয়। একদিকে ভোটার তালিকা নিয়ে উদ্বেগ, অন্যদিকে উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ঘোষণা— দুই সমান্তরাল বার্তা দিয়ে তিনি প্রশাসনিক সক্রিয়তা ও রাজনৈতিক লড়াই— দু’টোকেই সামনে রাখলেন।
২১ জন যুবকের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দিয়ে তিনি বলেন, “এই শুভ দিনে কিছু মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছি।”
উৎসব ও সম্প্রীতির বার্তা
রমজান মাস, আসন্ন হোলি-দোল— সবকিছুর প্রসঙ্গ টেনে তিনি শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা দেন। ধনধান্য স্টেডিয়ামে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় ২ মার্চ নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে হোলি উৎসব আয়োজনের ঘোষণা করেন।
গুরুদ্বার গেট নির্মাণ, রাসবিহারী গুরুদ্বারা থেকে পটনা সাহিব পর্যন্ত বাস যাত্রা— পাঞ্জাবি ও শিখ সম্প্রদায়ের সঙ্গেও সংযোগের কথা উল্লেখ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বহুসংস্কৃতির এই বার্তা আসলে ভোটের আগে সামাজিক মেরুকরণ ঠেকানোর কৌশলও হতে পারে।

বড় লড়াইয়ের ইঙ্গিত
এসআইআর ইস্যু এখন স্পষ্টতই রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে। যদি সত্যিই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ে, তবে তা আদালত, নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য সরকারের মধ্যে নতুন টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে।
মমতার বক্তব্যে বারবার ফিরে এসেছে একটি কথা— “কারও অধিকার ছিনিয়ে নেবেন না। নিজে বাঁচুন, সকলকে বাঁচতে দিন।” এই মানবিক সুরের আড়ালে কিন্তু রয়েছে কড়া রাজনৈতিক সতর্কবার্তা।
ভোটের আগে বাংলার রাজনীতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। এসআইআর প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের দিন ঘিরে এখন নজর গোটা রাজ্যের।
গণতন্ত্রের প্রশ্নে এই লড়াই কতদূর গড়ায়, তা সময়ই বলবে। তবে ভবানীপুরের মঞ্চ থেকে যে বার্তা গেল, তা স্পষ্ট— ভোটার তালিকা আর নিছক প্রশাসনিক নথি নয়, তা এখন বাংলার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কেন্দ্রবিন্দু।