সোনারপুর দক্ষিণে নজরকাড়া দ্বৈরথ, সম্পত্তি ও মামলা নিয়ে আলোচনায় রূপা
রাহুল সিংহ মজুমদার। কলকাতা সারাদিন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র এবার কার্যত হাইভোল্টেজ লড়াইয়ের মঞ্চ। একদিকে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের বিদায়ী বিধায়ক অরুন্ধতী মৈত্র ওরফে লাভলি, অন্যদিকে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে প্রথমবারের মতো নির্বাচনী ময়দানে নামা প্রাক্তন অভিনেত্রী ও রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই এই লড়াই ঘিরে বাড়ছে রাজনৈতিক কৌতূহল। এরই মাঝে রূপার জমা দেওয়া হলফনামা ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা।
রাজনৈতিক ময়দানে প্রথম সরাসরি পরীক্ষা
দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির সক্রিয় মুখ হিসেবে রাজ্যের রাজনীতিতে পরিচিত রূপা। ২০১৫ সালে দলে যোগ দেওয়ার পর থেকে একাধিক আন্দোলন, কর্মসূচি এবং প্রচারে তাঁকে সামনে থেকে দেখা গিয়েছে। শাসকদলের বিরুদ্ধে সরব অবস্থান নেওয়ায় তিনি বিজেপির অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত হন। তবে ভোটের লড়াইয়ে সরাসরি নামা এই প্রথম, ফলে এই কেন্দ্র তাঁর কাছে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে।
অন্যদিকে, তৃণমূলের প্রার্থী লাভলি মৈত্র ইতিমধ্যেই এই কেন্দ্রের বিদায়ী বিধায়ক। ফলে অভিজ্ঞতা বনাম নতুন চ্যালেঞ্জ—এই দ্বন্দ্বই সোনারপুর দক্ষিণের নির্বাচনী সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
হলফনামায় উঠে এল সম্পত্তির খতিয়ান
মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামায় রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের আর্থিক অবস্থার একটি বিস্তৃত চিত্র সামনে এসেছে। নগদ অর্থ হিসেবে তাঁর কাছে রয়েছে প্রায় এক লক্ষ টাকা। তবে তার চেয়েও বেশি নজর কেড়েছে তাঁর একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ও বিনিয়োগ।
মোট ১২টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রয়েছে তাঁর নামে, যার মধ্যে স্থায়ী আমানত ও অন্যান্য আর্থিক খাতও অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি মিউচুয়াল ফান্ড-সহ প্রায় ২৩টি জায়গায় বিনিয়োগের উল্লেখ রয়েছে। সব মিলিয়ে তাঁর অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ২.৪৪ কোটি টাকার কাছাকাছি।
গাড়ির ক্ষেত্রেও রয়েছে দুইটি চারচাকা—একটি ২০০৮ সালে কেনা এবং অন্যটি ২০১৭ সালে। এছাড়া প্রায় ৪৯৫ গ্রাম সোনার গয়না রয়েছে তাঁর কাছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য ৬৫ লক্ষ টাকারও বেশি।
একাধিক শহরে সম্পত্তি
স্থাবর সম্পত্তির দিক থেকেও রূপার অবস্থান বেশ শক্তিশালী। হাওড়ায় তিনটি জমি রয়েছে তাঁর নামে, যা তিনি কয়েক বছর আগে ক্রয় করেন। কলকাতার টালিগঞ্জে দুটি ফ্ল্যাট, সোনারপুর দক্ষিণে একটি বাড়ি এবং বোলপুরে আরও একটি বাড়ির উল্লেখ রয়েছে হলফনামায়।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, পশ্চিম মুম্বইয়েও তাঁর নামে একটি সম্পত্তি রয়েছে। সব মিলিয়ে স্থাবর সম্পত্তির মোট মূল্য প্রায় ৬.৯৫ কোটি টাকা। অস্থাবর সম্পত্তির সঙ্গে যোগ করলে মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৯.৩৯ কোটি টাকা।
আইনি মামলাও নজরে
শুধু সম্পত্তি নয়, রূপার হলফনামায় উঠে এসেছে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার কথাও। মোট পাঁচটি এফআইআর রয়েছে বিভিন্ন থানায়। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সরকারি কাজে বাধা, অবৈধ জমায়েত, বিক্ষোভ চলাকালীন সংঘর্ষ এবং অন্যান্য আইনি ধারা।
যদিও রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই ধরনের মামলা অনেক সময়ই আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত নেতাদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। ফলে এগুলিকে কতটা রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে দেখা হবে, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক তাৎপর্য কী?
সোনারপুর দক্ষিণ কেন্দ্রের এই লড়াই শুধুমাত্র দুই প্রার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে একদিকে রয়েছে শাসকদলের সংগঠনগত শক্তি ও স্থানীয় প্রভাব, অন্যদিকে বিজেপির নতুন মুখের উপর নির্ভর করে জনসমর্থন টানার চেষ্টা।
রূপার পরিচিতি, সাংস্কৃতিক পটভূমি এবং রাজনৈতিক সক্রিয়তা—সব মিলিয়ে বিজেপি এই কেন্দ্রে একটি আলাদা বার্তা দিতে চাইছে। অন্যদিকে তৃণমূলের কাছে এই আসন ধরে রাখা মর্যাদার প্রশ্ন।

ভোটগ্রহণ হবে ২৯ এপ্রিল, আর ফল ঘোষণা ৪ মে। তার আগে পর্যন্ত এই কেন্দ্রের রাজনৈতিক উত্তাপ যে আরও বাড়বে, তা বলাই যায়। সোনারপুর দক্ষিণ এখন কার্যত রাজ্যের অন্যতম নজরকাড়া আসনে পরিণত হয়েছে।