সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
কাশ্মীরের জঙ্গি হামলার পরবর্তী যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে রাজ্যে যেন কোনওভাবেই কালোবাজারির সুযোগ তৈরি না-হয়, সেই বিষয়ে কঠোর বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন সিঁদুর’ করে পহেলগাঁও হামলার যোগ্য জবাব দিয়েছে ভারত। পাকিস্তানও তলে তলে পাল্টা হামলা করার ছক কষছে। আর তার ফলে দাম বাড়তে পারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের। লাগামছাড়া দামের জেরে নাভিশ্বাস উঠতে পারে মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষজনের।
বৃহস্পতিবার নবান্নে রাজ্যের বাজার পরিস্থিতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি এই নির্দেশ দেন।
একই সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে মন্ত্রী ও আধিকারিকদের দ্রুত সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
আজ, বৃহস্পতিবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। তার আগে বৈঠক করেন ব্যবসায়ী এবং টাস্ক ফোর্সের সঙ্গে। আর সেখানেই শাক-সবজি-মাছের দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আলু, পেঁয়াজের দাম যেন আর না বাড়ে। গতবছর থেকে এখন দাম কম আছে। কিন্তু আদার দাম এত বেশি কেন? আদা আমরা উৎপাদন করতে কি পারি না? সেই জায়গা দেখা হোক। সুফল বাংলা ভাল কাজ করছে। আরও ১০০ আউটলেট হবে। বাজারের থেকে কম দামে সুফল বাংলা দিচ্ছে সবজি। এবার মাছও সুলভে দিতে হবে। কারণ মাছের দাম বেশ বেড়ে গিয়েছে। মাছ-ভাত যাঁরা খান তাঁরা কী করবেন?”
বর্তমান সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, নিজেদের ভাণ্ডার প্রস্তুত রাখা জরুরি হলেও, কেউ যেন এই সুযোগে ব্যক্তিগত মুনাফা লোটার চেষ্টা না-করে। তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “নিজেদের ভাণ্ডার প্রস্তুত রাখতে হবে ঠিকই, কিন্তু কেউ যেন এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগত মুনাফার চেষ্টা না-করে। প্রশাসন এ বিষয়ে কড়া পদক্ষেপ নেবে।”
বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী জানান, তাঁর মতে বর্তমানে রাজ্যের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আলু, পটল থেকে শুরু করে কাঁচালঙ্কা সহ প্রায় সব সবজির দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম। ফলে সাধারণ মানুষের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়েনি বলেই তিনি দাবি করেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “আমরা চাই বাজার স্থিতিশীল থাকুক। নিয়মিত বাজার পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা হবে। প্রয়োজনে ফের বৈঠক ডাকা হবে। সবাই যেন দেশটাকে নিজের বাড়ি মনে করে দায়িত্ব পালন করেন, তবেই কারও কোথাও খামতি থাকবে না।”
বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের অসুবিধা দূর করতে মন্ত্রী ও আধিকারিকদের আরও বেশি সক্রিয় হতে নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, “মানুষ যাতে কোনও অসুবিধায় না-পড়েন, তা নিশ্চিত করতে হবে। কেউ যদি দায়িত্বে গাফিলতি করে, প্রশাসন তাকে বিন্দুমাত্র ছাড়বে না।” সরকারি অফিসারদের নিয়মিত বাজার ও মানুষের সুবিধা প্রাপ্তির উপর নজরদারি চালানোর নির্দেশ দিয়ে তিনি আচমকা বা ‘সারপ্রাইজ ভিজিট’ করার কথাও বলেন।
মাছ-মাংসের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে এদিন বিশেষ গুরুত্ব দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি মৎস্য দফতরের সচিবকে স্পষ্ট নির্দেশ দেন, “মাছের দাম কমাতে হবে।” মৎস্য দফতরের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি ৭০০টি পুকুর ও ফিশারিজের বর্তমান অবস্থা জানতে চান এবং অভিযোগ করেন যে ফিশারিজ ডিপার্টমেন্ট ঠিকঠাক কাজ করছে না। তিনি এক আধিকারিককে উদ্দেশ্য করে বলেন, “বিপ্লববাবু, পলিসি ডিসিশনে মাথা গলাবেন না।” তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, কেন গত ২.৫ বছরে মৎস্যচাষে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। ছোট মাছ বড় হওয়ার আগেই ধরে নেওয়া হচ্ছে কিনা বা মাছ সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ কেন তৈরি হচ্ছে না, সে বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। ময়নার ও নলবনের সরকারি ভেড়িগুলির বর্তমান অবস্থা জানতে চেয়ে তিনি অভিযোগ করেন যে, কিছু লোক ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হচ্ছে এবং সরকারি প্রকল্পের সুফল সবার কাছে পৌঁছচ্ছে না। সরকার যা চাইছে, তা বাস্তবে রূপ পাচ্ছে না এবং এটা চলতে পারে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
পেঁয়াজ সহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যের মজুত ও সরবরাহ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ইতিমধ্যেই চার হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ মজুত করা হয়েছে এবং আরও ১,৩০০ মেট্রিক টনের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সুফল বাংলার মাধ্যমে বর্তমানে ৯০টি কেন্দ্র চালু রয়েছে, যা আরও ২০০টি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

বাজার নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে পদক্ষেপ নিতে মুখ্যমন্ত্রী সাতদিনের মধ্যে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করেছেন। কোন কোন পদক্ষেপ করতে হবে, তা পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করতে তিনি নির্দেশ দেন। পাশাপাশি জানান, “পোর্টালের মাধ্যমে অকশন ও সেটলমেন্টের প্রক্রিয়া শুরু হবে।” এই পদক্ষেপগুলি দ্রুত কার্যকর করার উপর তিনি জোর দেন। সব মিলিয়ে, বর্তমান সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকার মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে চলেছে।