সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
“আমরা বলেছি, নোটিফিকেশন আমরা চাইছি না। এখন সরকার দায়িত্ব নিয়ে, যাতে কোনওভাবে পরীক্ষা না হয়ে, নোটিফিকেশন না দিয়ে যাতে আমাদের চাকরিতে ফিরিয়ে আনা যায়, সেই ব্যবস্থাটা করুক।” বিকাশভবনে শিক্ষাসচিবের সঙ্গে বৈঠকে একথা জানিয়েছেন তাঁরা। সাংবাদিক বৈঠকে এমনই জানালেন চাকরিহারা শিক্ষকদের প্রতিনিধিরা।
সুপ্রিম কোর্টের রায় পুনর্বিবেচনার জন্য রাজ্য সরকারের তৈরি রিভিউ পিটিশনের খসড়ায় ‘সন্তুষ্ট’ চাকরিহারারা। সোমবার রাজ্যের শিক্ষাসচিবের সঙ্গে বৈঠকে তাঁরা একপ্রকার স্পষ্ট করে এই কথাটাও তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, নতুন করে কেউ পরীক্ষায় বসবেন না। পাশাপাশি তাঁদের অভিযোগ, আদালত সুবিচার দিতে পারেনি। তাই এবার আর শুধু বাংলা নয়, আন্দোলন হবে দিল্লিমুখীও। সোমবার শিক্ষাসচিবের সঙ্গে ২ ঘণ্টার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে একথা জানালেন আন্দোলনকারীর প্রতিনিধিরা।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বাতিল এসএসসির ২০১৬ সালের প্যানেল। চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মী। গোটা প্যানেল বাতিল করে চলতি বছরের মধ্যে নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়ার নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের। যদিও নতুন করে ফের পরীক্ষা দিতে নারাজ চাকরিহারাদের একাংশ। ওএমআর শিটের মিরর ইমেজ প্রকাশের দাবিতে সরব তাঁরা। নিজেদের চাকরি ফেরানোর দাবিতে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন চাকরিহারা শিক্ষকরা। এদিন তাঁদের ৬ প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন শিক্ষাসচিব বিনোদ কুমার। প্রায় ২ ঘণ্টা চলে বৈঠক। সেখান থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তাঁরা।
চাকরিহারা শিক্ষকদের প্রতিনিধি বলেন, “আমরা যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চের পক্ষ থেকে আজ বিকাশভবনে আধিকারিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলাম। আজ আমাদের আলোচনা হয়েছে বিকাশভবনে শিক্ষা দফতরের মুখ্যসচিব বিনোদ কুমার ও সেক্রেটারি শুভ্র চক্রবর্তী। আমাদের প্রথম আলোচনাতেই উঠে আসে রিভিউয়ের বিষয়ে সরকারের স্ট্যান্ড পয়েন্ট কী। ওঁরা বলেছেন, রিভিউ করার বিষয়ে সরকার এবং স্কুল সার্ভিস কমিশন যে ড্রাফ্ট তৈরি করেছে, সেটা যথার্থ এবং স্ট্রংলি যাতে সমস্ত যোগ্য শিক্ষক শিক্ষিকার চাকরি ফিরিয়ে আনা যায়, সেটা ওঁরা খুব স্ট্রংলি উপস্থাপন করেছেন। আমরাও দেখেছি, খসড়া বেশ ভালই হয়েছে। কিন্তু, সেই রিভিউ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের যে ভূমিকা, যে তৎপরতা সে বিষয়ে আমাদের একটা প্রশ্ন ছিল। ওঁরা বলেছেন, রিভিউ গ্রহণ করার বিষয় তো পুরোপুরি রাজ্য সরকারের হাতে থাকে না, সেটা সুপ্রিম কোর্টের একটা প্রসিডিওর বজায় রেখে হয়। আমরা বলেছিলাম, এখনও পর্যন্ত ডিফেক্ট ক্লিয়ার হচ্ছে না। ওঁরা জানিয়েছেন, রাজ্য সরকারের যে রিভিউ ফাইল সেটা ডিফেক্ট ক্লিয়ার হয়েছে। কমিশনেরটা সম্ভবত হয়নি। আমাদের প্রশ্ন ছিল, সামার ভ্যাকেশন চলছে। জুন মাসের এক তারিখ পর্যন্ত যে একটা পার্ট হিয়ারং হবে, সেক্ষেত্রে কি রিভিউ অ্যাকসেপ্ট হতে পারে ? ওঁরা বলেছেন, আমরা চেষ্টা করছি। এ বিষয়ে ওঁরা নিশ্চয়তা দিতে পারেননি।”
তিনি বলেন, “আমরা দাবি করেছিলাম, রাজ্য সরকার এবং আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী যে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে সমস্ত যোগ্যের চাকরি ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব পালন করবেন, সেটা যেন অবশ্যই দেখা হয়। সেটা রিভিউয়ের মধ্যে দিয়েই যেন আমাদের চাকরি সুনিশ্চিত করা হয়। এইটা আমরা তাঁদের জানিয়েছি। আমরা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেখছিলাম যে, নোটিফিকেশন পাবলিশ হবে। সেই বিষয়টা আমরা যখন জানতে চাই, তখন ওঁরা বলেন সুপ্রিম কোর্টের অর্ডারের উপর কেউ নেই। সুপ্রিম কোর্টের অর্ডার রাজ্য সরকার মানতে বাধ্য। এরকম ওঁদের বক্তব্য। আমরা বলি যে, আপনারা তো নোটিফিকেশন না করে একটা এমএ ফাইল করে যে রাজ্য সরকার রিভিউ ফাইল করেছে, রিভিউ ফাইলের রেজাল্টটা যতক্ষণ না আসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত যাতে নোটিফিকেশন না দিয়ে …রিভিউটাকে অ্যাকসেপ্ট করানো যায়, সেই ব্যবস্থা আপনারা করুন। সেক্ষেত্রে ওঁরা বললেন, সুপ্রিম কোর্টে আমরা নিজের থেকে এভাবে কিছু করতে পারি না। আমাদের জাজমেন্ট অর্ডার মানতে হবে।”
তাঁর সংযোজন, “আমাদের পক্ষ থেকে আমরা বলেছি যে আমরা যোগ্যতার নিরিখে চাকরি পেয়েছি। আমরা কোনওভাবেই পরীক্ষায় বসতে চাই না। আমাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা এখন পরীক্ষা দেওয়ার মতো নয়। একটা চাকরির জন্য আমরা যোগ্যতার পরীক্ষা দিয়েছি। আমরা কোনওভাবেই দেব না। ওঁরা আমাদের পরিস্থিতিটা বুঝেছেন। আমরা বললাম, অনেক রোগী আছেন। অনেক ক্যানসার রোগী, অনেক ম্যাডাম আছেন, তাঁদের পক্ষে কোনওভাবে পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। ওঁরা বললেন মিডিয়া মারফত দেখেছি। অর্থাৎ, ওঁরা আমাদের বিষয়টা জানেন।”

চাকরিহারা শিক্ষকদের প্রতিনিধি হাবিবুল্লার বক্তব্য, “এরপর থেকে আন্দোলনের অভিমুখ হবে দিল্লিমুখী। আর বাংলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আমাদের আধিকারিকদের দুর্নীতি দায়ী, কিন্তু আদালত আমাদের দিকটা দেখেনি, আমাদের সঙ্গে ন্যায় হয়নি। আমরা কীভাবে আন্দোলন দিল্লিমুখী করব, তা পরবর্তীকালে স্পষ্টভাবে জানানো হবে। পুনর্বিবেচনার যে আর্জি জানানো হয়েছে, সেটা যেন পুনর্বিবেচিত হয়।” তাঁদের কথায়, “যে রায় একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল। ফলে পরবর্তীকালে কোনও প্যানেলে যদি ২-৩ শতাংশও দুর্নীতি হয়ে থাকে, পুরো প্যানেলটাই বাতিল হবে।”
কোথায় সন্তুষ্ট হতে পারলেন না চাকরিহারা? চাকরিহারা শিক্ষক রাকেশ আলম বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম, শিক্ষামন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে। সেটা হয়নি। আমরা প্রথমেই তো সন্তুষ্ট হলাম না। কারণ সচিব তো আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না। আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর আমরা পাইনি। যাঁরা দিতে পারবেন, তাঁদেরই সাক্ষাৎ চাইছি।”