সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
“ভোটার লিস্টটা দেখবেন, মানুষকে যেন হেনস্থা করা না হয়।” ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে জাতীয় নির্বাচন কমিশন এবং তাদের নির্দেশে বুথ লেভেল অফিসাররা যেন সাধারণ মানুষকে কোন হেনস্থা না করে তেমন বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্য প্রশাসনকে না জানিয়েই এক হাজার সরকারি কর্মীকে ট্রেনিং-এর জন্য দিল্লি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বোলপুরের প্রশাসনিক সভা থেকে এমন অভিযোগ তুললেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে এভাবে না জানিয়ে যাতে আর কেউ কোনও কাজ না করে, সেই নির্দেশ স্পষ্টভাবে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্য প্রশাসনকে যাতে সবটা জানানো হয়, সেই বার্তা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “কোনও নির্দেশ এলে মুখ্যসচিবকে জানাবেন। আমাদের না জানিয়ে হুটপাট সিদ্ধান্ত নিয়ে নিচ্ছেন। কখনও এই জিনিস হয়নি। ভয় দেখালেই আপনারা ভয় পাবেন! তাহলে ঘরে বসে থাকুন।”
জেলাশাসকদের বার্তা দিয়ে মমতা বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ থেকে এক হাজার লোককে ট্রেনিংয়ের জন্য দিল্লি নিয়ে গিয়েছে। আমি জানতামই না। অনেক সময় ডিএম খেয়াল রাখছেন না। ডিএম-দের চোখ কান খুলে রাখতে হবে। আপনারা তো দেখছেন যাঁরা বাংলা যারা ভাষায় কথা বলছে, তাদের উপরে অত্যাচার হচ্ছে।”
স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিউ তথা বিশেষ নিবিড় সংশোধনের মাধ্যমে যখন বাংলার ভোটার তালিকা থেকে বহু লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তখন সোমবার বোলপুরে দাঁড়িয়ে বুথ লেভেল অফিসার তথা বিএলও-দের স্পষ্ট বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
মুখ্যমন্ত্রী এদিন পরিষ্কার করে বলেন, বিএলও-রা রাজ্য সরকারের কর্মচারী। সুতরাং তাঁদের দেখতে হবে ভোটার তালিকা থেকে যেন কারও নাম বাদ না যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এও বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, নির্বাচন কমিশন কিন্তু ভোট মিটে গেলে আর থাকবে না। বাংলার সরকারই থাকবে।
তাঁর কথায়, “ভোটের নোটিফিকেশন থেকে তা শেষ হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন থাকবে। তার বাইরে তাদের অধিকার নেই। মনে রাখবেন আপনারা রাজ্য সরকারের চাকরি করেন। কোনও মানুষকে হেনস্তা করবেন না। আজকে মামলার শুনানি আছে বলে বিস্তারিত বলছি না। দেখবেন যেন কাউকে হেনস্তা করা না হয়।”
বোলপুরের গীতাঞ্জলি স্টেডিয়ামে সোমবার প্রশাসনিক বৈঠক করেন মমতা। ওই বৈঠকে জেলাশাসকের ভূমিকায় ক্ষোভপ্রকাশ করে তিনি বলেন, “ডিএমদের চোখ কান খোলা রাখতে হবে। আমি অনেক সময় দেখছি ডিএমরা অধঃস্তনদের দায়িত্ব দিয়ে দিচ্ছে। তারা খেয়াল রাখছে না। বাংলা থেকে ১ হাজার লোককে প্রায় দিল্লিতে ট্রেনিং দিতে নিয়ে গেছে। আমি জানতাম না। ডিএমদের উচিত ছিল আমাকে জানানো। সিএসকে জানানো।”
বিএলও-দের উদ্দেশে তাঁর আর্জি, “আপনারা বিএলও যেসব লিস্ট করেছেন। আমার অনুরোধ থাকবে যাতে কারও নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যেন না যায় সেটা দেখার। নির্বাচন কমিশন যে তালিকা তৈরি করার করবে। যখন ভোটের দিনক্ষণ প্রকাশ হবে, তারপর নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। তার আগে বা পরে নয়। মনে রাখবেন আপনারা রাজ্য সরকারি কর্মী। কোনও মানুষকে অযথা হেনস্তা করবেন না। দেখবেন যেন মানুষ হেনস্তা না হয়। যারা দীর্ঘদিন এই রাজ্যের ভোটার। চারদিন গেলেন, সে নেই। হয়তো বেড়াতে গিয়েছে। তা বলে তাঁর নাম বাদ দিয়ে দেবেন? আপনাকে দেখতে হবে তাঁর অস্তিত্ব আছে কিনা। চারদিকে যাঁরা বাংলা ভাষায় বলছে তাঁরা হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। এই মানুষগুলির পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে।”

পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা
‘নিপীড়িত’ বাঙালিদের পাশে দাঁড়াতে হেল্পলাইনও চালু করেছে রাজ্য পুলিশ। রাজ্য পুলিশের তরফে চালু করা হেল্পলাইন নম্বরটি হল – ৯১৪৭৭২৭৬৬৬। আক্রান্তরা কিংবা আক্রান্তদের পরিবারের লোকজনেরা এই নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন। এই নম্বরটিতে নাম, ঠিকানা-সহ হোয়াটসঅ্যাপ করা যাবে। ওই অভিযোগ খতিয়ে দেখবে রাজ্য পুলিশ। পরে সংশ্লিষ্ট রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বাংলার পুলিশ। প্রয়োজনে জেলার কন্ট্রোল রুম এবং স্থানীয় থানায় যোগাযোগ করতে পারেন ‘আক্রান্ত’রা।
এবার বাঙালি ‘হেনস্তা’ রুখতে বড় পদক্ষেপ করলেন তিনি। সোমবার, বোলপুরের গীতাঞ্জলি প্রেক্ষাগৃহে প্রশাসনিক সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করলেন, ”বাইরে আমাদের ২২ লক্ষ। পরিযায়ী শ্রমিক কাজ করে। তাঁদের সবাইকে ফিরিয়ে আনুন এবার।” মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ, ”দরকার নেই দালালদের সাহায্য নিয়ে বাইরে গিয়ে কাজ করার। ওদের উপর অত্যাচার হলে দালালরা থাকে না, পালিয়ে যায়। ওঁরা ফিরে এলে এখানে যদি থাকার জায়গা থাকে, তাহলে তো ভালো। আর তা না থাকলে, আমরা ক্যাম্প বানিয়ে দেব। রেশন কার্ড, স্বাস্থ্যসাথী কার্ড, কর্মশ্রী প্রকল্পে ওঁদের কাজের ব্যবস্থা করে দেব। ওঁদের জব কার্ড দিয়ে দেওয়া হবে।” এই মুহূর্তে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে রাজ্য সরকারের তৈরি সেলের দায়িত্বে রয়েছে বীরভূমের ভূমিপুত্র তথা তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম। তাঁর উদ্দেশেই মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, ”সামিরুল, ওঁদের ফেরানোর ব্যবস্থা করো।”