সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
“বিচারব্যবস্থাকে সম্মান করি। কিন্তু রায় মানতে পারছি না। যাঁরা চাকরি করছেন, তাঁদের কোনও টাকা ফেরত দিতে হবে না বলে উল্লেখ রয়েছে রায়ে।” আজ বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্নার নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চের নির্দেশে বাংলার ২৫ হাজার ৭৫২ জনের চাকরি বাতিল হওয়ার নির্দেশের পরেই এভাবে নিজের প্রতিক্রিয়া জানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণা হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই নবান্নে মমতা জরুরি তরফ করেন রাজ্যের শিক্ষা মন্ত্রী ব্রাত্য বসুকে।
শিক্ষামন্ত্রী এবং প্রশাসনিক শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বৈঠকের পরে সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “বিচারব্যবস্থার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান আছে। কোনও বিচারপতির বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ নেই। আমিও আইনজীবী হিসেবে আমিও মামলা লড়েছি। পেশাদার হিসেবে না হলেও, মানবাধিকার এবং পড়ুয়াদের নিয়ে মামলা লড়েছি। কিন্তু দেশের নাগরিক হিসেবে আমার অধিকার আছে, আমি বিচারপতিকে সম্মান করেই বলছি, এই রায় মেনে নিতে পারছি না। আমি সমালোচনা না করলেও, রায় নিয়ে মতামত জানাতেই পারি মানবিকতার খাতিরে। আশাকরি বিকৃত করবে না, ভুল তথ্য ছড়াবেন না।”
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিভিন্ন পৃষ্ঠা ধরে ধরে ব্যাখ্যা করে এই নির্দেশের ফলে বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা কিভাবে ভয়ংকর ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরে মমতা বলেন, “আদালতের রায় পড়েছি আমরা। বলা হয়েছে, যাঁরা চাকরি করছেন, তাঁদের কোনও টাকা ফেরত দিতে হবে না। শেষ প্যারা, ৪৯-এ আদালত বলেছে, চাকরি বাতিল হয়েছে, বয়স এবং অন্য ক্ষেত্রে ছাড় দিয়ে নতুন করে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া যাবে। যাদের টেইন্টেড বলা হচ্ছে, আমাদের কাছে কোনও তথ্য নেই। আমাদের পড়তে দিলে না হয় খুঁজে বের করতাম। ভুলে যাবেন না, এঁরা সবাই স্কুলে পড়ান। স্কুলগুলির কী হবে, শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়াই কি বিজেপি-র লক্ষ্য? বাংলাকে আর কত নিশানা করবেন? আরও একটা জায়গায় আদালত বলেছে, তাদের রায় যেন তদন্তের উপর কোনও প্রভাব না ফেলে।”
বাংলা ও মধ্যপ্রদেশে ভিন্ন ব্যবস্থা কেন?
বাংলায় শিক্ষক নিয়োগ ক্ষেত্রে দুর্নীতির মামলায় দেশের সর্বোচ্চ আদালতে যেভাবে চরম সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছে তা অন্য রাজ্যের ক্ষেত্রে দেখা যায় না বলে ইঙ্গিত করে মমতা এদিন তুলে ধরেন মধ্যপ্রদেশের কথা। মধ্যপ্রদেশের ব্যাপম কাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে এনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “একটা রাজনৈতিক কথা বলছি এবার। এর সঙ্গে আদালতের কোনও যোগ নেই। কিন্তু মধ্যপ্রদেশে ব্যাপমকাণ্ডে কী হয়েছে? ৫০ জনের বেশি লোককে খুন হয়েছে। কী শাস্তি হয়েছে অপরাধীদের? আমাদের এখানে তো প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীকে সিবিআই জেলে রেখে দিয়েছেন! আমরা তো কিছু বলিনি সেই নিয়ে! একই অপরাধীর কতবার শাস্তি হয়? একজনের অপরাধে কতজনের শাস্তি হয়? তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই এর মধ্যে দু’-চার জন আছে, যাদের ওরা টার্গেট করেছে। আমরা তদন্ত করে যদি বিশদ তথ্য পাই, নিশ্চয়ই করব। এসএসসি একটি স্বতন্ত্র সংস্থা। তাদের কাজে আমরা নাক গলাই না। আমরা রায় গ্রহণ করছি। ওরা তিন মাসের মধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বলেছে, করে দেব। শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছি। শিক্ষামন্ত্রীকে বলেছি, এসএসসি-কে আমাদের মনোভাব জানাতে। তারা কী করবে, তাদের সিদ্ধান্ত। তবে আমাদের অনুভূতি হল, তিন মাসের মধ্যে চাকরি বাতিল হওয়া ২৫ হাজার এবং সেই সময় যাঁরা আবেদন করেছিলেন, তাঁদের নিয়োগ প্রক্রিয়া যেন হয়ে যায়। তাঁদের ভবিষ্যৎ যেন হিন্দোলে দোলা না খায়।”
সিপিএমকে তীব্র আক্রমণ মমতার
প্রায় ২৬ হাজার চাকরি বাতিলের জন্য প্রথম থেকে সব থেকে বেশি ছুটে বেড়িয়েছেন সিপিএমের রাজ্যসভার সাংসদ বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য। আজ ২৬ হাজার চাকরি বাতিলের জন্য তাকেই কাঠগড়ায় তোলেন মমতা। আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকেও একহাত নিয়ে তিনি বলেন, “আমরা মানবিক ভাবে পাশে দাঁড়াতে এসেছি। মানুষ বিপদে পড়লে মনে ব্যথা হয়। ২৫ হাজার মানে ২৫ হাজার নয়, যৌথ পরিবার রয়েছে। কয়েক লক্ষ মানুষের জীবন জড়িয়ে রয়েছে এখানে। আমি অবাক হয়ে যাই, এখানে মামলা করেছিলেন বিকাশবাবু। তিনি তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আইনজীবী। কেন তিনি এখনও নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন না আমি জানি না। পাওয়া উচিত। ভাবছি সুপারিশ করব। এত মানুষের চাকরি পাওয়ার পর বিজেপি-র মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলছেন, সরি আমি ওঁর নাম নিতে চাই না। আমি দেখেছি। বলেছেন, অযোগ্যদের জন্য যোগ্যদের চাকরি গিয়েছে, তার জন্য না কি আমি দায়ী! তা আপনারা যখন মামলা করলেন, একবারও ভাবলেন না কারা যোগ্য, কারা অযোগ্য! সেটা সরকারকেও ভাবতে দিলেন না। আপনারা নিজে যোগ্য তো? সবসময় বাংলাকে কেন নিশানা করা হবে? বাংলার ছেলেমেয়েরা কী দোষ করেছে? এখনও ১ লক্ষ শূন্যপদ রয়েছে। এই মামলার জন্য করতে পারছিলাম না। আগে এটার সমাধান হোক। হাতে আরও ১ লক্ষ আছে। রায় মেনে এসএসসি সিদ্ধান্ত নেবে।”
“বিজেপি-র টার্গেট বুঝি আমি”
এভাবে এক ধাক্কায়ে বাংলার প্রায় 26 হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিল করার পিছনে বিজেপির সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে বিস্ফোরক অভিযোগ করে মমতা বলেন, “যাদের বাতিল করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ১১ হাজার ৬১০ জন নবম এবং দশমে পড়াতেন। ৫৫৯৬ জন একাদশ-দ্বাদশে পড়াতেন। বাকিরা অন্য শ্রেণিতে। নবম-দশম, একাদশ-দ্বাদশের গুরুত্ব দানেন। এঁরা অনেকে খাতাও দেখছেন। ২৬ হাজারকে বাতিল করা হলে স্কুলে পড়াবেন কে? তার মানে কি বিজেপি, সিপিএম শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে চাইছে? একবার লজ্জা হল না? সিপিএম নিজের আমলে কী করত? চিরকূটে চাকরি দিত। গণশক্তি যতজন রিপোর্টার চাকরি করেন, তাঁদের স্ত্রীদের চিরকূটে চাকরি দিয়েছেন। কই তার তো তদন্ত হয় না! বিজেপি-র রাজ্যে তো তদন্ত হয় না! কেউ অপরাধ করলে সমান সাজা হওয়া উচিত। শুধু বাংলার মানুষের ভাগ্যে সারাক্ষণ কেন ব্যাভিচার, দূরাচার, দুষ্টাচার, মিথ্যাচার, দর্ভোগ, দুর্যোগ, দুশ্চিন্তা, আশঙ্কা কেন থাকবে? বাংলায় জন্মানো কি অপরাধ? না কি বাংলার প্রতিভাকে ওরা ভয় পায়? ২৫ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা না পড়াতে পারলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইপিএস, আইএএস, শিক্ষক, অধ্যাপক তৈরি করবে কারা? প্রবেশ পথটাকে ভেঙে দেওয়ার নেপথ্যে বাংলাকে পিছিয়ে দেওয়ার ভাবনা রয়েছে। শিক্ষার মানটাকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে না তো? আমি বাংলায় জন্মেছি। বিজেপি-র টার্গেট বুঝি আমি। তাই প্রশ্ন করছি।”
বিচারপতি আর শিক্ষকদের আলাদা রায় কেন?
সম্প্রতি দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতির বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া টাকার প্রসঙ্গ তুলে মমতা বলেন, “আমার ব্যক্তিগত প্রশ্ন, কাউকে আক্রমণ করছি না। ভুল হতে পারে, কিন্তু আমার মনে হয়েছে যা, তা বলছি। এক কর্মরত বিচারপতির বাড়ি থেকে ১৫ কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছে। তাঁর শাস্তি যদি শুধু বদলি হয়, তাহলে এই ২৫ হাজার ভাইবোনকেও বদলি করতে পারত! সুবুদ্ধি হোক সকলে। আর একটা কথা, হাইকোর্টের এই রায়টা যিনি দিয়েছিলেন, তিনি এখন বিজেপি-র সাংসদ। বিচারব্যবস্থা ছেড়ে সাংসদ হয়েছেন, গাঙ্গুলি, না ডাংগুলি। আমি ঠিক আসল নাম জানি না, পরে জেনে নেব, সরি। ঠিক মতো নাম জানি না। আজ তাঁরা কোন মুখে বড় বড় কথা বলেন। তাঁদের দায়বদ্ধতা নেই! আমি বিশ্বাস করি এটা বিজেপি, সিপিএম করিয়েছে। আগামী দিনে এর জবাব ভাল ভাবে পাবেন তাঁরা। আমি শুধু শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রীদের বলব, বিপদে যখন সকলে পালিয়ে যায় ছেড়ে, কেউ না কেউ রক্ষা করতে আসেন। কাউকে না কাউকে সেই দায়িত্ব নিতে হবে। এটাই সঠিক সময়। এটা বিজেপি এবং সিপিএম-এর জন্য সতর্কবার্তা।”

“কোনও একটা ঘটনা ঘটলে কে দায়ী থাকবে?”
২০১৬ সালে যে সময় এই নিয়োগ দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছিল সেই সময় রাজ্যে কারা মন্ত্রী ছিল তার রেকর্ড খুঁজে বের করে রাজনৈতিকভাবে তার মোকাবিলা করা হবে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এদিন সরাসরি শুভেন্দু অধিকারীর নাম না করে কার্যত এর আগেও যেভাবে বহুবার শুভেন্দুর বিরুদ্ধে পূর্ব মেদিনীপুরে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছিলেন তার ইঙ্গিত দিয়ে মমতা বলেন, “চাকরি দেওয়ার ক্ষমতা নেই, কেড়ে নেবেন না। রায় কেড়ে নিয়েছে যেমন, পথও দেখিয়েছে। আমরাও সেটা করব। আমরাও কিন্তু রেকর্ড খুঁজে বের করব। ২০১৬ সালে কারা মন্ত্রী ছিলেন? একটা জেলা আমি জানি কিসের বিনিময়ে চাকরি হয়েছে, আমি খুঁজে দেখব। কারও কাছে তথ্য থাকলে জানাবেন। সাহায্য হবে। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বলব, অবসাদে যাবেন না। কোনও একটা ঘটনা ঘটলে কে দায়ী থাকবে? আমরা চাই না, এমন কিছু ঘটুক। তাই পাশে দাঁড়িয়েছি। যাঁদের বাতিল হয়েছে চাকরি, এসএসসি যা করার করবে, আমি বলছি, টাকা ফেরত দিতে হবে না। আমাদের আইনজীবীরাও দেখবে। আমি সবাইকে বলব, আপনারা সংগঠন তৈরি করেছেন। তাঁরা শিক্ষামন্ত্রীকে অনুরোধ করুন যে তাঁরা একত্রিত হতে চান এবং শিক্ষামন্ত্রী-সহ আমি যদি সভায় উপস্থিত থাকি, সমাজের গুণী-জ্ঞানীজন, আইনজীবীরাও যদি থাকেন। আমি তাঁদের কথায় সাড়া দিয়ে ৭ এপ্রিল ইন্ডোর স্টেডিয়ামে ১২টা ১৫-য় যাব। তাঁদের কথা শুনতে যাব। বলব, ধৈর্য হারাবেন না, মানসিক চাপ নেবেন না। আপনাদের সবাইকে আবেদন করতে বলেছে, করুন। আমরাও চেষ্টা করব, তাড়াতাড়ি যাতে সমস্যার সমাধান হয়। কারও মায়ের চিকিৎসা রয়েছে, কারও মাথায় ঋণ রয়েছে, ছেলেমেয়েদের পডা়শোনা রয়েছে। বিজেপি এবং সিপিএম-এর দয়ায় ভবঘুরে হয়ে ঘুরতে হবে। এই পরিবার অচল হয়ে গেলে বিজেপি এবং সিপিএম-ও অচল হয়ে যাবে, এটা মাথায় রাখবেন। কোনও ঘটনা ঘটলে দায় আপনাদের নিতে হবে।
আদালতের কথা মেনেই যা করার করব। যাঁরা বঞ্চিত হয়েছি, তাঁদের বলছি, পাশে ছিলাম, আছি এবং থাকব। তাতে যদি বিজেপি আমাদের জেলে পুরে দেয়, আমি স্বাগত জানাই। ক্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান।”