সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন ।
২০২৫ সালে ভারতের মেট্রো শহরগুলিতে বাড়ি ও ফ্ল্যাটের দাম নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। রিয়েল এস্টেট রিপোর্ট অনুযায়ী, শীর্ষ ১৩টি শহরে মার্চ ২০২৫-এ আবাসন মূল্যে গড়ে ৮% বৃদ্ধি হয়েছে, আর দিল্লি-এনসিআর ও বেঙ্গালুরুর মতো শহরে এই বৃদ্ধি ১৪% পর্যন্ত ছুঁয়েছে। বিশেষ করে প্রিমিয়াম ও লাক্সারি সেগমেন্টে চাহিদা বাড়ায় বিশেষজ্ঞরা পুরো বছরের জন্য আরও ৬.৫% বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিচ্ছেন।
কিন্তু এই দামের উল্লম্ফনের একটি অপ্রত্যাশিত সামাজিক প্রভাবও দেখা যাচ্ছে—Urban Hobosexuality in India। এই শব্দটি শুনতে হালকা মনে হলেও, বাস্তবে এটি জটিল আবেগ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত।
হোবোসেক্সুয়ালিটি আসলে কী?
‘হোবোসেক্সুয়াল’ শব্দটি প্রথমে পশ্চিমা দেশগুলিতে জনপ্রিয় হয়, যেখানে কোনও ব্যক্তি মূলত থাকার জায়গার সুবিধা পেতে প্রেম বা সম্পর্কে জড়ায়। এর অর্থ, সম্পর্কটি বাইরে থেকে রোমান্টিক মনে হলেও, ভেতরে আসল উদ্দেশ্য হয় আর্থিক সুবিধা—বিশেষত আবাসনের খরচ বাঁচানো।
এখন ভারতের মেট্রো শহরগুলোতেও এই প্রবণতা ধীরে ধীরে দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে যেখানে ভাড়া আকাশছোঁয়া। মুম্বই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু—এই শহরগুলিতে একা থাকা মানুষের জন্য বাড়ি ভাড়ায় মাসিক আয়ের বড় অংশ খরচ হয়ে যায়, ফলে সম্পর্কের মধ্যে অর্থনৈতিক স্বার্থ ঢুকে পড়ছে।
বাড়ির দাম ও ভাড়ার চাপ
মেট্রো শহরে একা থাকলে মাসিক আয়ের ৪০%-এর বেশি ভাড়ায় চলে যায়। মুম্বইতে এই হার প্রায় ৪৮%। Deloitte 2025 Gen Z and Millennial Work Survey অনুযায়ী, দেশের ৫০% এর বেশি তরুণ কর্মী মাস শেষে প্রায় শূন্য হাতে থাকেন। এই অর্থনৈতিক চাপ অনেককে এমন সঙ্গী খুঁজতে উদ্বুদ্ধ করছে, যার সঙ্গে থাকলে ভাড়া বা বাড়ির খরচ ভাগ করা যায়—বা পুরোপুরি সেভ করা যায়।
সম্পর্কের ভেতরের অসমতা
মনোবিদ চন্দনী তুগনায়েত জানিয়েছেন, এখন অনেকেই এমন সঙ্গীর সঙ্গে থাকছেন যিনি আবেগগত, আর্থিক বা দৈনন্দিন কাজে সামান্য অবদান রাখেন, অথচ জীবনে বড় জায়গা দখল করে আছেন। বাইরে থেকে সম্পর্কটি রোম্যান্টিক মনে হলেও ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়—যেখানে একজন সঙ্গী অপরজনের তুলনায় অনেক বেশি সুবিধা পান।
একটি উদাহরণ—অঙ্কিতা (নাম পরিবর্তিত), এক সফল উদ্যোক্তা, তার সঙ্গীকে নিজের ফ্ল্যাটে থাকতে দেন। কিন্তু পরে দেখেন, ভাড়া, বিদ্যুৎ, খাবারের খরচ সব তিনিই দিচ্ছেন, আর তার সঙ্গীর অবদান সীমিত কুকুর হাঁটানো বা রান্নায় সাহায্য করা পর্যন্ত। আবেগগত সমর্থনের সময়ে, সঙ্গীকে পাশে পাওয়া যেত না।
কেন বাড়ছে এই প্রবণতা?
Urban Hobosexuality in India বাড়ার পেছনে কয়েকটি মূল কারণ—
1. আবাসন ব্যয়ের উল্লম্ফন – ভাড়া ও ফ্ল্যাটের দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া।
2. সামাজিক চাপ – বিয়ে বা সম্পর্কে জড়ানোর প্রত্যাশা।
3. আধুনিক ডেটিং সংস্কৃতি – দ্রুত ঘনিষ্ঠ হওয়া, অতিরিক্ত স্নেহ প্রদর্শন এবং ‘ভান করা দুর্বলতা’ মানুষের বিচারশক্তি দুর্বল করে দেয়।
4. সংগ্রামের গ্ল্যামারাইজেশন – ‘উদ্ধারকর্তা’ হওয়ার ইচ্ছে বা সহানুভূতির কারণে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল সঙ্গীকে মেনে নেন।
এর সামাজিক ও মানসিক প্রভাব
এ ধরনের সম্পর্ক প্রথমদিকে সহজ সমাধান মনে হলেও, সময়ের সঙ্গে মানসিক চাপ তৈরি করে। একজন সঙ্গী যদি নিয়মিতভাবে বেশি আর্থিক বোঝা বহন করেন, তবে হতাশা, ক্ষোভ ও আত্মসম্মানহানির অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
মনোবিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের পরিস্থিতিতে স্পষ্ট যোগাযোগ ও সীমা নির্ধারণ জরুরি। নইলে সম্পর্কের সমতা নষ্ট হয় এবং দু’জনের মধ্যে অবিশ্বাস বেড়ে যায়।
কিভাবে বুঝবেন সম্পর্কটি হোবোসেক্সুয়াল কিনা?
সঙ্গী হঠাৎ খুব দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
অর্থনৈতিক অবদান প্রায় নেই, অথচ থাকার সুবিধা নিচ্ছে।
আপনার আর্থিক সাহায্য ছাড়া সঙ্গী তার জীবনযাপন চালাতে পারবে না।
আবেগগত সমর্থনের মুহূর্তে সঙ্গীকে অনুপস্থিত পাওয়া যায়।

সমাধান ও সচেতনতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘হোবোসেক্সুয়ালিটি’ নিয়ে আলোচনা মানে আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষকে দোষ দেওয়া নয়। বরং এটি বোঝানো যে সম্পর্ক সমতা, সম্মান ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা দরকার, তবে নিজের সীমাও স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি।

ভারতের মেট্রো শহরে বাড়ি ও ফ্ল্যাটের ক্রমবর্ধমান দাম শুধু রিয়েল এস্টেট বাজার নয়, ব্যক্তিগত সম্পর্কের উপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। Urban Hobosexuality in India তারই একটি উদাহরণ—যেখানে প্রেম, আবাসন এবং আর্থিক বাস্তবতা মিশে একটি জটিল সামাজিক প্রবণতা তৈরি করছে। সচেতনতা, খোলামেলা আলোচনা ও আর্থিক স্বচ্ছতা ছাড়া এই ধরনের সম্পর্কের ফাঁদ এড়ানো কঠিন।