সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
বাংলার রাজনীতিতে মতুয়া সমাজের ভোট সবসময়েই বড় ফ্যাক্টর। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি-র সাফল্যের অন্যতম ভরসা ছিল এই ভোটব্যাঙ্ক। কিন্তু নির্বাচনের আগে ফের একবার বিজেপি বিধায়ক সুব্রত ঠাকুর বনাম কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের দ্বন্দ্ব সামনে আসায় উত্তাল ঠাকুরবাড়ি। আর এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করেই মতুয়া মহলের ভেতরে তীব্র অশান্তির ছবি ধরা পড়েছে।
বিবাদের কেন্দ্রবিন্দু: মতুয়া কার্ড ও ধর্মীয় শংসাপত্র
মতুয়া সমাজ বহু বছর ধরেই নাগরিকত্ব আইন (CAA) কার্যকর হওয়ার আশায় ছিল। বিজেপি বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনও পর্যন্ত পুরোপুরি আইন কার্যকর হয়নি। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে “মতুয়া কার্ড” তৈরি এবং “ধর্মীয় শংসাপত্র” বিতরণ।
অভিযোগ, এই কাজের দায়িত্ব শান্তনু ঠাকুরের নিয়ন্ত্রণাধীন সংগঠনের হাতে গিয়েছে। ফলে সাধারণ মতুয়া পরিবার বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে—কারা এই শংসাপত্র পাচ্ছেন আর কারা পাচ্ছেন না, সেই প্রশ্ন থেকেই অসন্তোষ বাড়ছে।
সুব্রত ঠাকুরের বিস্ফোরক অভিযোগ
বিজেপি বিধায়ক সুব্রত ঠাকুর সরাসরি বলেন,
“মতুয়া সমাজের নামে নতুন কার্ড ও শংসাপত্র বানানো হচ্ছে। কিন্তু এর কোনও বাস্তব মূল্য নেই। সাধারণ মানুষের জীবনে এর কোনও কাজ নেই। এগুলো নিছক ভোটের রাজনীতি।”
তাঁর দাবি, এখনও পর্যন্ত মতুয়া সমাজ প্রতিশ্রুত CAA সুবিধা পায়নি। অথচ কাগজপত্র তৈরি করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। এভাবেই মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা তুলছেন শান্তনু ঠাকুর।
শান্তনু ঠাকুরের পাল্টা
শান্তনুর ঘনিষ্ঠ মহলের বক্তব্য, অভিযোগগুলি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাঁদের দাবি, সমাজের ঐক্য রক্ষার জন্যই এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। “মতুয়া ঐতিহ্য ধরে রাখা এবং আগামী প্রজন্মকে পরিচয় সম্পর্কে সচেতন করাই আসল লক্ষ্য,” বলেন শান্তনুর অনুগামীরা।
পরিবারে বিভক্তি: মা বনাম বাবা
ঠাকুর পরিবারের ভেতরে দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়েছে।
মা ছবিরানি ঠাকুর বড় ছেলে সুব্রতের পাশে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করেছেন, “শান্তনুর নেতৃত্বে কিছু লোক ঠাকুরবাড়ির পরিবেশ নষ্ট করছে।”
অপরদিকে বাবা তথা প্রাক্তন মন্ত্রী মঞ্জুলকৃষ্ণ ঠাকুর ছোট ছেলে শান্তনুর পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, “যদি কোনও মতপার্থক্য থেকেও থাকে, তা পরিবারের মধ্যে আলোচনা করে মেটানো যেত। বাইরের রাজনীতি ঢোকানো উচিত হয়নি।”
নাটমন্দিরে ‘সিএএ সহযোগিতা শিবির’ নিয়েই বিস্ফোরণ
বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্র নাটমন্দির। শান্তনুর উদ্যোগে সেখানে CAA আবেদনকারীদের জন্য সহযোগিতা শিবির চালু হয়েছে। শিবির থেকে মতুয়া ভক্তদের ধর্মীয় পরিচয় সংক্রান্ত শংসাপত্র দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু সুব্রতের প্রশ্ন—
“নাটমন্দির ভক্তদের জায়গা। সেখানে কেন সিএএ সহযোগিতা শিবির হবে?”
শান্তনুর দাবি—
“ভক্তদের সুবিধার জন্যই শিবির চলছে। কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। সরকারের কাছে আবেদন জমা দিতে যাতে সমস্যা না হয়, সেই সাহায্য দিচ্ছি।”
নির্বাচনের আগে অস্বস্তিতে বিজেপি
বিধানসভা ভোটের আগে বিজেপির ভেতরে এ ধরনের দ্বন্দ্ব গেরুয়া শিবিরের জন্য বড় ধাক্কা। ২০২১-এ উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া ও দক্ষিণবঙ্গের অনেক জেলায় মতুয়া ভোট বিজেপিকে আসন জিততে সাহায্য করেছিল।
কিন্তু এবার যদি মতুয়া মহল বিভক্ত হয়ে যায়, তবে তা সরাসরি বিজেপির আসন সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
তৃণমূলের কৌশল
তৃণমূল কংগ্রেস বরাবরই মতুয়া সমাজকে কাছে টানতে চেয়েছে। তৃণমূলের দাবি—বিজেপি শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কাজের কাজ কিছুই করেনি। CAA কার্যকর না হওয়ার ঘটনাই তার বড় প্রমাণ।
রাজনৈতিক মহল মনে করছে, বিজেপির এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে হাতিয়ার করেই তৃণমূল আগামী নির্বাচনে মতুয়া ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করবে।
মতুয়ার আঙিনায় ক্ষোভ
মতুয়া সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষ এখন দ্বিধাবিভক্ত।
একাংশের দাবি, বিজেপি শুধু মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
অন্য অংশের মতে, এখনও সময় আছে, কেন্দ্র শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি রাখবে।
তবে বিশ্লেষকরা একমত—সুব্রত ঠাকুরের মতো জনপ্রতিনিধি প্রকাশ্যে অভিযোগ করলে সমাজে অসন্তোষ আরও বাড়বে।

BJP MLA Subrata Thakur accuses Shantanu Thakur – এই ঘটনাটি শুধু ঠাকুরবাড়ির পারিবারিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং আগামী নির্বাচনে বিজেপির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িয়ে। মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক যদি বিভক্ত হয়ে যায়, তবে তা সরাসরি প্রভাব ফেলবে বাংলার ভোটের ফলাফলে।