শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
অশান্ত পরিস্থিতির মধ্যে পদত্যাগ করলেন নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক (Ramesh Lekhak)। দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠক চলাকালীন তিনি প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির কাছে নৈতিক দায়িত্ব স্বীকার করে ইস্তফাপত্র জমা দেন।
বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে (Nepal social media ban protest) এখনও পর্যন্ত অন্তত ১৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
উত্তপ্ত হয়ে উঠলো ভারতের আর এক প্রতিবেশী দেশ নেপাল (Nepal)। দফায় দফায় সরকার বিরোধী আন্দোলনে নিহত হয়েছেন ১৯ জন এবং আহত প্রায় ৫০ জন। কাউকে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করতে দেখলেই গুলি করার নির্দেশ দিয়েছে নেপাল সরকার। ৪ সেপ্টেম্বর থেকে নেপালে ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স (পূর্বতন টুইটার) সহ ২৬টি জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
যার প্রতিবাদে সোমবার রাজধানী কাঠমান্ডুর নিউ বাণেশ্বরে বিক্ষোভ দেখান জেন-জি প্রজন্ম। অর্থাৎ মূলত ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে যুবক-যুবতীরা এই বিক্ষোভে সামিল হন।
দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট-এর তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে ৭জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিভিল হাসপাতাল ও ন্যাশনাল ট্রমা সেন্টারে মারা যান।
জানা যায়, রাজধানীর সংসদ ভবনের সামনে কাঁটাতার ভেঙে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী জমায়েত হলে পুলিশ পিছু হটে। পরে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনা মোতায়েন করা হয় এবং সংসদ ভবন, সরকারি সচিবালয়, প্রেসিডেন্ট ভবনসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কার্ফু জারি করা হয়।
বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় মিছিল প্রদর্শন করেন। তাঁদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল – “সোশ্যাল মিডিয়া নয়, দুর্নীতি বন্ধ করো”, “যুবসমাজ দুর্নীতির বিরুদ্ধে” ইত্যাদি।
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে এক সরকারি নির্দেশিকায় বলা হয়, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, ইউটিউব সহ ওই ২৬টি সংস্থাকে সাতদিন সময় দেওয়া হয়েছিল নথিভুক্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য। কিন্তু সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। এরপরেই এগুলি বন্ধের রায় দেয় নেপালের সুপ্রিম কোর্ট।
গত ২৮ আগস্ট মন্ত্রক সংস্থাগুলিকে নথিপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করেছিল। বুধবার সময়সীমা শেষ হয়। কিন্তু সেই নির্দেশের পরেও নথিভুক্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেনি। যার ফলেই এই পদক্ষেপ। সরকারের দাবি, ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও এক্স একাধিকবার নির্দেশ পেলেও তা মানেনি। বিদেশি সংস্থার কেউই কোনও আবেদন দেয়নি বলে খবর।
অন্যদিকে, টিকটক, ভাইবার, উইটক এবং পপো লাইভ-এর মতো অ্যাপগুলি নিজেদের সরকারের তালিকাভুক্ত করে রেখেছে আগেই। টেলিগ্রাম এবং গ্লোবাল ডায়েরির মতে, সংস্থাগুলি বর্তমানে সরকারের অনুমোদন পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সেকারণে এই সমস্ত সমাজমাধ্যমগুলোর পরিষেবাগুলি চালু রয়েছে নেপালে।
অশান্ত নেপাল ভারতের কাছে অবশ্যই অতি উদ্বেগের বিষয়। যার শিকড় অত্যন্ত গভীরে পোঁতা রয়েছে। সীমান্ত সমস্যা, চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, অস্ত্র ও মাদক পাচার ও জাল নোট নিয়ে ভাবনা রয়েছে ভারতের। নেপালের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক আজকের নয়, রামায়ণের যুগ থেকে। নেপালের যুবসমাজের এই ক্ষোভের কারণ শুধু সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করে দেওয়ার জন্য নয়। ক্ষুদ্র পাহাড়ি রাষ্ট্রের জেন জি প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা চাইছে পালাবদলের। ‘গণতান্ত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষ’ সরকারের কাজকর্মে তারা হতাশ। তাই ভিতরে ভিতরে ফের হিন্দুরাষ্ট্র ও রাজতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার একটা চোরাস্রোত বয়ে চলেছে কিছুকাল ধরে। বিশেষত, একদা খতম হয়ে যাওয়া রাজবংশের উত্তরসূরি জ্ঞানেন্দ্র বিক্রম সিং দেব (যিনি নেপালের শেষ রাজা) ঘরে ফেরা ইস্তক দেশে একটি অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
২০০১-২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনিই ছিলেন নেপালের রাজা। ২০০১ সালে রাজপরিবারে গণহত্যার নায়ক জ্ঞানেন্দ্র সিংহাসনে বসেন। কিন্তু মাওবাদী গৃহযুদ্ধে প্রচণ্ডর নেতৃত্বে সিংহাসনচ্যুত হয়ে বিদেশে পালিয়ে যান রাজা। তারপরেই রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে নেপাল প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। কিন্তু জ্ঞানেন্দ্রর ফিরে আসাকেও রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ তাঁর ফেরার দিনেই কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে ও তাঁর যাত্রাপথে বিশাল জমায়েত হয়েছিল। যেখান থেকে স্লোগান উঠেছিল, ফিরুক রাজতন্ত্র, হোক হিন্দু রাষ্ট্র।
দেশে ফেরার পর তিনি একটি ভিডিও বার্তায় দেশবাসীকে চলমান অপশাসনের বিরুদ্ধে সরব হতে আহ্বান জানান। তারপরই সক্রিয় হয় রাজ পরিবারের ঘনিষ্ঠ দল রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি। সেই দলই বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল এর আগেই। সেবারেও ব্যাপক মারামারি, কার্ফু জারি করতে হয়েছিল।
মাওবাদী নেতা ছিলেন এককালে। তবে এখন সেই দুর্গা প্রসাই রাজতন্ত্র এবং হিন্দু রাষ্ট্রের দাবি তুলে সরব হয়েছেন নেপালে। চলমান আন্দোলনের অন্যতম ‘মুখ’ এই প্রাক্তন মাওবাদী কমান্ডার। নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সরকার কড়া হাতে দমন করতে পারেন রাজতন্ত্রের দাবি তোলা রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে। একটি রিপোর্টে দাবি করা হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় প্রজাতান্ত্রিক পার্টির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট রবীন্দ্র মিশ্র এবং সাংসদ তথা দলের সাধারণ সম্পাদক সমশের রানার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করা হতে পারে। আপাতত তাঁরা জেল হেফাজতে আছেন। তাঁদের মধ্যে সমশের রানা ক্যানসার আক্রান্ত। তিনি ভারতে চিকিৎসা করাচ্ছিলেন। তবে রানা এবং রবীন্দ্রর পাসপোর্ট ‘বাজেয়াপ্ত’ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে রিপোর্টে।
নেপালে রাজতন্ত্র ও হিন্দুত্ব ফিরিয়ে আনার দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তাতে আরপিপি ছাড়া অংশ নিচ্ছে বেশ কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। এই সব দল এবং সংগঠন মিলে গড়ে উঠেছে জয়েন্ট পিপলস মুভমেন্ট কমিটি। সেই কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা প্রাক্তন মাও নেতা দুর্গা। পুলিশের অভিযোগ, গত ২৮ মার্চ কাঠমান্ডুতে অশান্তির সূচনা তিনিই করেছিলেন। সেদিনের সেই হিংসায় মারা গিয়েছিলেন ৩ জন। আরপিপির শীর্ষ স্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতা সহ শতাধিক মানুষকে গ্রেফতার করা হয়।

মানুষের সেই ক্ষোভেই ঘি ঢেলেছে সরকার নিজেই। দুর্নীতি, দমনপীড়ন এবং নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অনাস্থার আগুনে জ্বলছে দেশ। তরুণ-কিশোররা রাস্তায় নেমে দাবি তুলছেন সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ না করে দুর্নীতি বন্ধ হোক। শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশের মতোই তাঁদের সকলের হাতেই লাল-নীল জাতীয় পতাকা। এর ছাত্র বললেন, আমাদের প্রতিবাদ কেবল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে যা নেপালে এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। আরেক ছাত্র জানান, সরকার কর্তৃত্ববাদী হয়ে গিয়েছে, আমরা এর শেষ দেখতে চাই।