সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
বাংলায় উৎসবের মরশুম শেষ হতে না হতেই এবারে রীতিমতো অ্যাকশন মোডে মাঠে নেমে পড়ল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। চাকরি দুর্নীতি এবং পুরসভায় নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তে এর আগে কয়েকবার কেন্দ্রীয় এজেন্সির তল্লাশি অভিযান রাজ্য জুড়ে চললেও। আজ নজিরবিহীন ভাবে বাংলার অন্তত 24 জায়গায় একযোগে তল্লাশি অভিযান শুরু করলো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের গোয়েন্দারা। কলকাতা সহ দুর্গাপুর, হাওড়া এবং পুরুলিয়া জেলার বিভিন্ন প্রান্তে মোট ২৪টি ঠিকানায় একযোগে এই অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানে ইতিমধ্যেই কোটি কোটি নগদ টাকা এবং সোনার গয়না উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযোগ, বৈধ ও অবৈধ খাদান থেকে জাল চালান তৈরি করে বছরের পর বছর ধরে সেই একই চালান বারবার ব্যবহার করে কয়লা চুরি হচ্ছে। এই কয়লা চুরিতে প্রভাবশালী কোনো যোগ রয়েছে কি না, সেদিকটাও খতিয়ে ইডি। মোট ১০০ জনের বেশি ইডি আধিকারিক এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী যুক্ত রয়েছেন এই অভিযানে। অভিযোগ, বৈধ খাদান থেকেই অবৈধভাবে কয়লার চালান করা হত। কখনও একই চালান বারবার ব্যবহার করে কয়লা চুরি হত। আবার কখনও অবৈধ খাদান থেকে কয়লা নিয়ে তারপর সেটিকে বৈধ ভাবে চালান করে পাচার করা হত। এই সব তথ্যই বের করার জন্য তল্লাশি চালাচ্ছে ইডি। তল্লাশি অভিযানে যাঁদের বাড়িতে রেইড চলছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন ব্যবসায়ী নরেন্দ্র খারকা, অনীল গোয়াল, যুধিষ্ঠির ঘোষ এবং কৃষ্ণ মুরারি কয়াল।
এর আগেও কয়লা পাচার মামলায় দিল্লিতে তলব করা হয়েছিল ব্যবসায়ী নরেন্দ্র খারকাকে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে শক্তিগড়ে কয়লা ব্যবসায়ী রাজু ঝাকে খুনের ঘটনায় তাঁর নাম উঠে আসায় তিনি ফের তদন্তকারীদের নজরে আসেন। জানা গিয়েছে, আজ ইডি সল্টলেকে সেক্টর ২-এর সিজে ব্লকে এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে অভিযান চালাচ্ছে। এছাড়া সল্টলেকের একে ব্লকেও এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে তল্লাশি চালাচ্ছে ইডি। বাইপাস সংলগ্ন একটি আবাসনেও চলছে অভিযান। হাওড়ার সলপ মোড়েও এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে তল্লাশি চালাচ্ছে ইডি। ঝাড়খণ্ডে কয়লা মাফিয়া থেকে শুরু করে বিসিসিএল ঠিকাদার, ইসিএল আধিকারিকদের বাড়িতে অভিযান চালাচ্ছে ইডি। কয়লা ব্যবসায়ী লালবাবু সিং-এর ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে হানা দিয়েছে ইডিষ এই লালবাবু সিংয়ের সংস্থায় এর আগে আয়কর বিভাগ অভিযান চালিয়ে ১০০ কোটি টাকা নগদ পেয়েছিল। এদিকে লালবাবুর ভাই কুম্ভনাথ সিংহের একাধিক ঠিকানাতেও তল্লাশি চালাচ্ছে ইডি। প্রায় দশ বছর আগে লালবাবুর বাড়ি এবং অফিসে তল্লাশি চালিয়েছিল সিবিআই। সেবার বিসিসিএল-এর টেন্ডার দুর্নীতির অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। সেই সময় কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছিল এই কয়লা ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। সম্প্রতি সিবিআই আদালতে ইডি জানিয়েছিল, কয়লা পাচার মামলায় খুব শীঘ্রই সামনে আসবে প্রভাবশালীদের নাম। এই আবহে লালবাবু সহ বাংলার একাধিক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে ইডি।

এদিকে এই রাজ্য ছাড়িয়ে পড়শি ঝাড়খণ্ডের ধানবাদেরও একাধিক জায়গায় অভিযান চালাচ্ছেন ইডি আধিকারিকরা। সেই সব জায়গা ঘিরে রেখেছেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা। রাঁচিতে অন্তত ১৮টি জায়গায় অভিযান চালানো হয়েছে। সেখানে ব্যবসায়ী অনীল গোয়াল, সঞ্জয় উদ্ধোগ, এলবি সিং এবং অমর মণ্ডল-এর মতো বেআইনি কয়লা কারবারিদের নাম উঠে এসেছে। তাঁদের একাধিক সম্পত্তি এলাকায় রেইড চলছে। ইডি-র প্রাথমিক অনুমান, এই বেআইনি কারবারে কয়েকশো কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। প্রসঙ্গত, কয়লার পাশাপাশি বালি পাচার মামলাতেও সম্প্রতি সক্রিয় হয়েছে ইডি। গত সেপ্টেম্বর মাসে ঝাড়গ্রামের গোপীবল্লভপুর এলাকার এক ব্যক্তির বাড়িতে তল্লাশি চালানোর পর উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়াতেও একই মামলার সূত্র ধরে অভিযান চলেছিল। তবে আজকের এই অভিযান কয়লা পাচারের মূল চক্রের শিকড় উপড়ে ফেলার লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।