সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকে ঘিরে এক অভূতপূর্ব বিতর্ক তৈরি হল দেশজুড়ে। অভিযোগ, তাঁর সঙ্গে তাঁর মায়ের বয়সের পার্থক্য নাকি ১৫ বছরের কম—এই অদ্ভুত যুক্তি দেখিয়ে শান্তিনিকেতনের বাড়ি ‘প্রতীচী’-তে শুনানির নোটিশ পাঠিয়েছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। বিষয়টি সামনে আসতেই প্রশ্ন উঠছে, তথ্যের এমন স্পষ্ট ভুল থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একজন বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বকে এভাবে হেনস্থা করা হল?
জাতীয় নির্বাচন কমিশনের দাবি, স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়ার সময় অমর্ত্য সেন যে ফর্ম জমা দিয়েছিলেন, তাতে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ বা তথ্যগত অসঙ্গতি রয়েছে। ফর্মে মা বা বাবার সঙ্গে বয়সের পার্থক্য ১৫ বছর দেখানো হয়েছে, যা স্বাভাবিক নয়—এই কারণেই নাকি শুনানির নোটিশ। অথচ বাস্তব তথ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সরকারি নথি ও ২০০২ সালের ভোটার তালিকা—যাকে কমিশন নিজেই ‘স্ট্যান্ডার্ড ডেটাবেস’ হিসেবে ধরেছে—সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, অমর্ত্য সেনের জন্ম ১৯৩৩ সালে এবং তাঁর মা অমিতা সেনের জন্ম ১৯১৪ সালে। অর্থাৎ মা-ছেলের বয়সের পার্থক্য সাড়ে ১৯ বছরেরও বেশি। এই তথ্য নোবেল কমিটির নথিতেও লিপিবদ্ধ। তা হলে কমিশন ঠিক কোন তথ্যের ভিত্তিতে এই নোটিশ পাঠাল, সে প্রশ্নের সদুত্তর মেলেনি।
আজ সকালে নির্বাচন কমিশনের তরফে ইআরও তানিয়া রায় এবং বিএলও সোমব্রত মুখোপাধ্যায় শান্তিনিকেতনে গিয়ে অমর্ত্য সেনের মামাতো ভাই শান্তভানু সেনের হাতে নোটিশ তুলে দেন। ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম কোনও ভারতরত্ন ও নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্বকে এসআইআর শুনানির নোটিশ পাঠানো হল—এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্টদের।
নোটিশ হাতে পাওয়ার পর শান্তভানু সেন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “দাদাকে হেনস্থা করার উদ্দেশ্যেই এই নোটিশ। উনি আগেও ভোট দিয়েছেন, নিয়ম মেনেই ফর্ম জমা দিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও এমন প্রশ্ন তোলা দুঃখজনক।” একই সুর শোনা যায় অমর্ত্য সেনের বাড়ির দেখভালের দায়িত্বে থাকা গীতিকণ্ঠ মজুমদারের কণ্ঠেও। তাঁর কথায়, “মায়ের সঙ্গে বয়সের পার্থক্য সাড়ে ১৯ বছর—এটা সর্বজনবিদিত। কীভাবে ১৫ বছরের কম বলা হল, বুঝতে পারছি না।”
আগামী ১৬ জানুয়ারি দুপুর ১২টার মধ্যে সমস্ত নথি জমা দিতে বলা হয়েছে অমর্ত্য সেনকে। যদিও বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, বিজেপি-নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কমিশন ইচ্ছাকৃতভাবে দেশের গর্বকে হেনস্থা করছে। কটাক্ষ করে বলা হয়েছে, তথ্য-প্রযুক্তি আর ‘হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি’ ব্যর্থ হওয়ায় এবার নাকি জীববিজ্ঞান নিয়েও কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘনিষ্ঠ আশুতোষ সেন ও অমিতা সেনের সন্তান, যাঁর নামকরণ করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ—সেই অমর্ত্য সেনকে এমন তুচ্ছ ও হাস্যকর যুক্তিতে নোটিশ পাঠানো শুধু প্রশাসনিক ভুল নয়, বলেই মনে করছেন অনেকে। প্রশ্ন উঠছে, এটা কি নিছক তথ্যগত গাফিলতি, না কি পরিকল্পিত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হেনস্থা?
![]()
এই খবর প্রকাশ্যে আসার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজেপিকে আক্রমণ করে তৃণমূল লেখে, “বিজেপি তাদের ‘দালাল’ নির্বাচন কমিশনকে সঙ্গে নিয়ে আজকাল জীববিজ্ঞান নিয়েও কাটাছেঁড়া শুরু করেছে। ভারতবর্ষের গর্ব নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনকে ‘বয়সের পার্থক্য’-এর মতো এক হাস্যকর অজুহাতে শুনানির নোটিশ পাঠিয়েছে কমিশন। এটা আসলে নিয়ম-কানুনের প্রতি চূড়ান্ত অবহেলারই প্রমাণ। ‘হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি’র ধাপ্পাবাজি ধোপে না টেকায়, এখন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে হেনস্থা করার জন্য এরা একটা আস্ত ‘আজগুবি বিভাগ’ খুলে বসেছে।”