সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘দিল্লিতে বসে বৈধ ভোটার বাদ দেওয়ার চক্রান্ত করা হয়েছে। এসআইআরে বৈধ ভোটারের নাম বাদ যাচ্ছে। ৫৪ লক্ষের মধ্যে বেশিরভাগ বৈধ ভোটার বাদ পড়েছে।’ মঙ্গলবার আরো একবার জাতীয় নির্বাচন কমিশনের এআই দিয়ে নাম বাদ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
নবান্ন থেকে তিনি বলেন, ‘মনে রাখবেন আদালতে মামলা চলছে। আইন মেনে কাজ করুন। সংবিধান বহির্ভূত কাজ করবেন না। সব নথি নিয়ে যাওয়ার পরেও বলা হচ্ছে এলিজিবেল নয়। ওরা যে এটা লিখছে প্রথমে জানতে পারিনি। বিএলএ ২-দের ঢোকার কথা ছিল। তবে বিজেপির বিএলএ টু না থাকায় আমাদের বিএলএদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। যে লোকটার নাম বাদ দিচ্ছে, সেই লোকটার কারণ জানার অধিকার নেই কেন নাম বাদ গেল? অ্যাসোশিয়েশন কিন্তু নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে যে তারা নাম বাদ দেয়নি। সেই তালিকা সামনে আসেনি।’
নির্বাচন কমিশনকে এখনও পাঁচটি চিঠি পাঠিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। যদিও সেসবের উত্তর এখনও আসেনি। বহু ভোটারদের মৃত বলে ঘোষণা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘লজিক্যাল ডিক্রিপেন্সি ছিল না কিন্তু প্রথমে। এটা নতুন করে দখলদাসদের মাথা থেকে বের হয়েছে। ১ কোটি ৩৬ লাখের তালিকা করেছে। এই তালিকা কারও কাছে নেই। কোনও পার্টিকে দেয়নি। নিজেরা বিজেপি পার্টি অফিসে রেখে দিয়েছে। বিহার-হরিয়ানা-মহারাষ্ট্র ধরতে পারেনি। বহিরাগত দিয়ে ভোট করিয়ে বাংলা দখলের ছক কষা হয়েছে। যেভাবে অন্যান্য রাজ্যে হয়েছিল। মাইক্রো-অবজারভার বিজেপির দলদাস। ইতিমধ্যেই আমাদের কাছে খবর এসেছে, শুনানিতে ডাকার পরে লগিং করার পরে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ডিএমরা নাম তুলতে পারেননি। ভোটার ঠিক করে নির্বাচিত সরকার ঠিক করে দিচ্ছে কমিশন। ৮৪ জন মারা গিয়েছে। ৪ জন আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল। ১৭ জনের স্ট্রোক হয়েছে। মোট ১০৫ জনের মতো মানুষের জীবন সঙ্কটে। এর দায় কমিশন-বিজেপি পার্টিকে নিতে হবে।’
সীমান্ত নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা থেকে শুরু করে ভোটার তালিকা সংশোধন ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ— একাধিক বিষয়ে ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন, ‘কয়লা থেকে হাওয়ালা— সীমান্ত কার হাতে? কাস্টমস কার হাতে? সিআইএসএফ কার হাতে? বাইরে থেকে কে প্লেনে আসছে, সবই তো কেন্দ্র দেখে। আর্মিও তোমাদের হাতে।’ তাঁর অভিযোগ, সেনাবাহিনী ও কেন্দ্রীয় সংস্থার একাংশকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, ফোর্ট উইলিয়মের এক কমান্ড্যান্ট নাকি এসআইআর ও বিজেপির হয়ে কাজ করছেন। ‘প্লিজ এটা করবেন না।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘যাঁরা সত্যিকারের চোর-ডাকাত, তাঁদের ধরুন।’ মধ্যপ্রদেশের এক নেতার বাংলায় উপস্থিতি নিয়েও কটাক্ষ করে বলেন, বাংলায় শান্তিতে থাকতে পারেন, এখানকার মিষ্টিও খাওয়ানো হবে, কিন্তু বাংলার মানুষকে যেন হেনস্থা না করা হয়। ডবল ইঞ্জিন সরকারের রাজ্যগুলিতে বাঙালিদের উপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে প্রশ্ন তোলেন— ‘ওখানে মারবেন, আর এখানে এসে বাঙালির নাম বাদ দেবেন?’
অন্যদিকে, রাতের অন্ধকারে একটি রহস্যজনক গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি চালাতেই সামনে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, বিজেপি নেতাদের একটি গাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৪,০০০টি ফর্ম ৭—ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটার আবেদনপত্র। শুধু তাই নয়, ফর্মগুলির অধিকাংশেই আগে থেকেই লেখা ছিল জেলার বিভিন্ন এলাকার ভোটারদের নাম ও ব্যক্তিগত তথ্য। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার সাংবাদিক বৈঠকে কার্যত বিস্ফোরক মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনকে এক বন্ধনীতে রেখে তিনি বলেন, ‘একটা ছবি দেখাচ্ছি। গাড়িতে করে প্রায় ১০ হাজার ফর্ম নিয়ে গেছে ডিলিট করার জন্য। ফাইলের পর ফাইল, বস্তায় বস্তায় কাগজ।’
এরপরই কমিশন-বিজেপিকে এক বন্ধনীতে রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এগুলো মানুষের অধিকার চুরি নয়? তথ্য চুরি করছে, গণতন্ত্র চুরি করছে। জ্যান্ত মানুষকে মেরে ফেলতে চাইছে।’

নির্বাচন কমিশনের ভুলে মিস ম্যাচ হয়েছে বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। না জানিয়েই ভোটারদের নাম কেটে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাঁর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘এখানকার ভুড়িওয়ালা, নাম বলতে ঘেন্না লাগে। তিনি বলছেন তিনটে ক্লেম জমা পড়েছে। মানুষ ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা বসে আছেন। মানুষ জানতেই পারছে না কার নাম বাদ গেল। গত পরশু ড্রাফট লিস্ট বেরিয়েছে। সবার পক্ষে এত কোটি কোটি পাতা খুঁজে নাম দেখা সম্ভব নয়। কোনও কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়েই অনৈতিকভাবে বাদ দিয়েছে। যে মহিলারা বিয়ে করে টাইটেল পরিবর্তন করেছেন তাঁদের নাম বাদ গিয়েছে। ঠিকানা বদল হয়েছে তাঁদের নাম বাদ গিয়েছে। মানুষকে নিয়ে খেলা করা হচ্ছে। বলছে ইআরও বাদ দিয়েছে। অথচ ইআরও জানে না। যার নাম প্রথম পর্যায়ে ডিলিট করা হয়েছে তাদের ফর্ম ৬, ৭ ফিলাপের অধিকার আছে।’