সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে নির্বাচন কমিশন চলছে।’ এভাবেই দিল্লি থেকে বাংলার ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তীব্র খুব উগরে দিয়ে মমতা বলেন, ‘সবাইকে হিয়ারিংয়ের নোটিশ পাঠানো হয়েছে। রোল অবর্জাভারদের কোনও ভূমিকা নেই। আপনারা ভাবতে পারেন, নোবেলজয়ীকে বাবা-মায়ের বয়সের ব্যবধান জানতে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। অমর্ত্য সেন, জয় গোস্বামী। জয় গোস্বামীর বয়স ৮০ র বেশি। তিনিও সুপ্রিম কোর্টে এসেছেন। তাঁকেও নোটিশ পাঠানো হয়েছে।’
দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার কেন্দ্রের শাসকদলের নির্দেশে বাংলার অন্তত ২ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত করছেন বলে অভিযোগ করে তার অপসারণের জন্য সংসদে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনার দাবি তুললেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বলেন, আমি চাই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ইমপিচমেন্ট হোক। তবে আমাদের সংখ্যা নেই। কিন্তু রেকর্ড থাকবে। কোনও কিছু যদি জেনুইন হয়, প্র্যাকটিক্যাল হয় এবং জনতার ভালোর জন্য হয়। আমরাও চাইব তাঁর ইমপিচমেন্ট হোক। কিন্তু, ইমপিচমেন্ট তো হতে পারে। ধারা তো রয়েছে। রেকর্ড তো হয়ে যাবে। উনি যদি এমন করেন, তবে আমরা আমাদের সাংসদদের সঙ্গে আলোচনা করে জনগণের স্বার্থে এককাট্টা হয়ে কাজ করি। এতে আমাদের কোনও আপত্তি নেই।
তবে শুধুমাত্র প্রতিবাদ করা নয় সংবিধান মেনে দেশের বিচার ব্যবস্থার কাছে বিচার চেয়ে মমতা বলেন, ‘আমরা এখন সব দরজায় কড়া নাড়ছি। সংবাদমাধ্যমও গণতন্ত্রের একটা স্তম্ভ। এসআইআরে আক্রান্তদের নিয়ে এসেছি। আপনারাই দেখুন তাঁদের অবস্থা। দিল্লির সংবাদমাধ্যমের তো জানার কথা নয়, বাংলায় কী ঘটছে! নির্বাচন কমিশনে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নিজেদের কথা জানাতে গিয়েছিলাম। আমাদের কথা শোনা হয়নি। অপমান করা হয়েছে। কারণ তারা বিজেপির হয়ে কাজ করছে বলে আমরা মনে করি।’ মমতার প্রশ্ন, ‘৩০ শতাংশের বেশি সংখ্যালঘু মানুষ আছেন। তাদের কি আমরা বের করে দেব? বিজেপির সব মুখ্যমন্ত্রী, নেতা, সব এজেন্সি সবাই বাংলায় গিয়ে ঘাঁটি গেড়েছে। কিন্তু ওরা ভুলে গিয়েছেন, ক্ষমতা চিরকাল কারও কাছে থাকে না।’
নিজের বিধানসভা কেন্দ্র ভবানীপুরের উদাহরণ টেনে মমতা বলেন, ‘আমার ভবানীপুর কেন্দ্রে ৪০ হাজার বাদ দিয়েছে। তারপর নানা ভাবে ৭০ হাজার নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। কে এইগুলো করছেন? এআই-এর সাহায্যে করছেন। গতকাল দেখা করে বলেছি। কারা সরকার তৈরি করবে,কমিশন নাকি ভোটাররা? দিল্লির জমিদাররা ভোটের অধিকার ছিনিয়ে নিচ্ছে। ঘুসপেটিয়ার দায় কার? সীমান্ত, রেল সবই তো কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। অনেকেই এসে অপকর্ম করতে পারেন। আমাদের কোনও তথ্য দেওয়া হয় না। অনেকবার চিঠি লিখেছি। কাজ হয়নি। বাংলায় কথা বললেই বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’
গতকাল সোমবার নির্বাচন কমিশনে ঠিক কী ঘটেছিল? এসআইআর-এ কি নির্দিষ্ট কোনো দলকে টার্গেট করা হচ্ছে? তৃণমূল সুপ্রিমোর জবাব, ‘অবশ্যই তৃণমূলকে টার্গেট করা হচ্ছে। অন্য দলের হলেও কম। নির্বাচন কমিশনার আমাদের হুমকি দিচ্ছিলেন। আমরাও বলেছি, আমরা আপনাদের বন্ডেড লেবার নই। তারপর বয়কট করেছি।’ এসআইআর বিতর্কে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে রেট্রোস্পেক্টিভ ল আনার কথা বলেছেন রাহুল গান্ধী। মমতার মতে, ‘ইম্পিচমেন্ট হতে পারে। আমরা দলকে বলব অংশ নিতে।’
একাই লড়বে তৃণমূল
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর পর্বে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ৫৮ লাখ নাম বাদ পড়েছে। কিন্তু তারপরেও বাংলাতে একলা চলার বার্তা দিয়েই দিল্লি থেকে মঙ্গলবার কার্যত ভোটের দামামা বাজিয়ে দিলেন তৃণমূল নেত্রী। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মমতার স্পষ্ট বার্তা, বাংলার ভোটে কোনও প্রভাবই পড়বে না এসআইআর’ পর্বের। বিজেপিকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মমতার দাবি, তাঁর দল তৃণমূল আরও বেশি আসনে জিতবে।সাংবাদিক বৈঠক শেষে আত্মবিশ্বাসী মমতা জানান, আবার দিল্লি আসবেন ভোটে জেতার পর। তাঁর কথায়, ‘ভোটে জিতে দিল্লি আসব। তখন আপনাদের ভাল মিষ্টি খাওয়াব।’ তার পরেই কিছুটা রসিকতা করেই সাংবাদিকদের উদ্দেশে মমতা বলেন, ‘দিল্লির লাড্ডু নয়।’

প্রসঙ্গত, গত রবিবারই এসআইআর-এ ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ পরিবারের লোকেদের নিয়ে দিল্লি সফরে এসেছেন মমতা। সোমবার তিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। কিন্তু সেখানে তাঁকে অপমান করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে বৈঠক বয়কট করেন তিনি। এর পর মঙ্গলবার বঙ্গভবনে ‘ক্ষতিগ্রস্ত’দের পরিবারদের সঙ্গে নিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করেন তৃণমূলনেত্রী। নির্বাচন কমিশনের খাতায় ‘মৃত’। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর তালিকায় নাম নেই তাঁদের। তবে বাস্তবে তাঁরা জীবিত। দিল্লির চাণক্যপুরীর নয়া বঙ্গভবনে সাংবাদিক বৈঠকে তেমনই কয়েকজন ‘ভূতে’র পরিচয় করালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দিল্লির সংবাদমাধ্যমের সামনে তাঁদের দেখিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিলেন তিনি। এর আগে বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে একাধিক জনসভায় এভাবেই ‘ভূতে’দের সামনে এনেছেন মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা। তাঁদের মধ্যে কেউ এসআইআর ‘আতঙ্কে’ মৃতদের পরিবার। আবার কেউ কেউ রয়েছেন এসআইআর-এর ‘চাপে’ নিহত বিএলও-র পরিজন। মঙ্গলবার তাঁদের সকলকে সঙ্গে নিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করেন মমতা। পাশেই ছিলেন অভিষেক।
কমিশনকে দুষে মমতা বলেন, ‘তথ্য অসংগতির তালিকা দিতে বলেছে সুপ্রিম কোর্ট। তারা নাম বদলে দিচ্ছে। বিজেপি নেতাদের অবজার্ভার করে পাঠাচ্ছে। আমি সবাইকে দোষ দিচ্ছি না। আমি কমিশনকে সম্মান করি। তবে কয়েকজন তোতাপাখির মতো কাজ করছেন।’ সাংবাদিকদের তরফে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এসআইআর-এর পর বাংলায় যে বিধানসভা ভোট হতে চলেছে, তাতে তৃণমূলের রণনীতি কী হবে। তার জবাবে মমতা বলেন, ‘আমাদের অনেক সাংসদ, বিধায়ক, ব্লক প্রেসিডেন্ট, বুথ প্রেসিডেন্ট রয়েছে। আমি নিজে একা কোনও সিদ্ধান্ত নেব না তো। আমাদের গণতান্ত্রিক দল। আমরা এক ইঞ্চি জমিও ছাড়ব।’