সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
“এ পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি..” কবির কথাকে বাস্তবায়নের জন্য ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিল বাংলার সরকার।
শীত পড়লেই কলকাতার আকাশে ধোঁয়াশা ঘনিয়ে আসে। চোখ জ্বালা, গলায় অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট—বায়ুদূষণের প্রভাব যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই সময়ে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (CREA)-এর মাসিক এয়ার কোয়ালিটি রিপোর্টেও শহরের দূষণমাত্রা বৃদ্ধির ইঙ্গিত মিলেছে।
সেই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দিয়েই বড় পদক্ষেপ নিল Kolkata Municipal Corporation (KMC)।
২০২৬–২৭ অর্থবর্ষের বাজেটে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে মূলত কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রাস্তার ধুলো নিয়ন্ত্রণের পরিকাঠামো শক্তিশালী করতে। লক্ষ্য একটাই—কলকাতার বাতাসকে আরও পরিষ্কার ও বাসযোগ্য করে তোলা।
রাস্তার ধুলো কমাতে মেকানাইজড উদ্যোগ
শহুরে বায়ুদূষণের অন্যতম বড় কারণ রাস্তার উপর জমে থাকা সূক্ষ্ম ধুলো। যানবাহনের চাকা ও বাতাসের ঘূর্ণিতে সেই ধুলো বাতাসে মিশে যায় এবং শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে। এই সমস্যা মোকাবিলায় KMC আনতে চলেছে একাধিক আধুনিক যন্ত্র—সেলফ-প্রোপেলড রোড সুইপিং মেশিন, ব্যাটারি চালিত মেকানিক্যাল সুইপার, লিটার-সাকিং মেশিন এবং জল ছিটানোর গাড়ি।
প্রথম পর্যায়ে প্রায় ২০টি মেশিন শহরের বিভিন্ন বরোতে মোতায়েন করার পরিকল্পনা রয়েছে। কাজের ফলাফল সন্তোষজনক হলে ভবিষ্যতে আরও মেশিন কেনা হবে বলে জানিয়েছেন পুরসভার কর্তারা।
শহরের ব্যস্ত রাস্তায় বিশেষ নজর
কলকাতার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও যানজটপূর্ণ রাস্তায় এই বড় সুইপিং মেশিনগুলো চালানো হবে। এর মধ্যে রয়েছে বিটি রোড, শ্যামবাজার পাঁচমাথা, এপিসি রায় রোড, সি.আর. অ্যাভিনিউ, জে.এল. নেহরু রোড, পার্ক স্ট্রিট, ক্যামাক স্ট্রিট, আশুতোষ মুখার্জি রোড, হাজরা রোড, রাসবিহারী, গড়িয়াহাট, ডায়মন্ড হারবার রোড এবং যাদবপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।
এই সমস্ত রাস্তায় প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক যানবাহন চলাচল করে। ফলে এখানে ধুলো জমার প্রবণতাও বেশি। বড় আকারের স্বয়ংক্রিয় সুইপিং মেশিন দ্রুত ও কার্যকরভাবে রাস্তার উপর জমে থাকা ধুলো সরাতে সক্ষম হবে, যা সরাসরি বাতাসের গুণমান উন্নত করতে সাহায্য করবে।
গলি ও উপগলিতেও বদল
কলকাতার আর এক বড় চ্যালেঞ্জ হল সরু গলি ও উপগলি। এতদিন এই এলাকাগুলিতে মূলত ঝাঁটা দিয়ে হাতেকলমে পরিষ্কার করার উপর নির্ভর করতে হত। এতে সময় বেশি লাগে, আবার অনেক ক্ষেত্রেই ধুলো পুরোপুরি সরানো যায় না।
এই সমস্যার সমাধানে আনা হচ্ছে ব্যাটারি চালিত ছোট মেকানিক্যাল সুইপার, যা সরু রাস্তাতেও সহজে চলাচল করতে পারবে। ফলে গলি এলাকাতেও দ্রুত ও কার্যকর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বাতাসে ভাসমান ধুলিকণাও কমবে, যা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাস করবে।
বিদ্যুৎচালিত ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি
পুরসভা সূত্রে জানা গেছে, নতুন যন্ত্রগুলির বেশিরভাগই বিদ্যুৎচালিত বা কম নির্গমন প্রযুক্তিনির্ভর। এর ফলে পরিষ্কার করার প্রক্রিয়াতেই আবার অতিরিক্ত দূষণ তৈরি হবে না। অর্থাৎ, একদিকে রাস্তার ধুলো কমবে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়বে।
শুধু তা-ই নয়, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হবে এই বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে। কারণ রাস্তার ধুলো নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়মিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে বর্জ্য অপসারণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শীতকালে দূষণ কেন বাড়ে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকালে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা ও বাতাসের গতি কম থাকায় দূষিত কণা সহজে উপরে উঠতে পারে না। ফলে তা নিচের স্তরেই জমে থাকে এবং দূষণের মাত্রা বেড়ে যায়। তাই এই সময়ে রাস্তার ধুলো নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে ওঠে।

পরিষ্কার, স্বাস্থ্যকর কলকাতার লক্ষ্যে
১০০ কোটি টাকার এই বিনিয়োগ কেবল যন্ত্র কেনার পরিকল্পনা নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির অংশ। প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিক পরিকাঠামো গড়ে তুলে কলকাতাকে আরও পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর এবং টেকসই শহর হিসেবে গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য।
বায়ুদূষণ রোধে প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতাও সমান জরুরি। তবে পুরসভার এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে শহরের পরিবেশ রক্ষায় বড়সড় বার্তা দিচ্ছে—কলকাতা এবার দূষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আরও সংগঠিত এবং প্রস্তুত।