সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন। সুরাট, গুজরাট |
ভারতের ডাবল ইঞ্জিন সরকার চালিত রাজ্য গুলির মধ্যে বাঙালি হেনস্থার নতুন নজির গড়ল গুজরাট। বাংলায় কথা বলার “অপরাধে” পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলার ১৬ জন শ্রমিককে আটক করল গুজরাট পুলিশ।
এই শ্রমিকরা কর্মসূত্রে গিয়েছিলেন গুজরাটের সুরাটে। সেখানেই ২৬ জুলাই রাতে আচমকাই স্থানীয় পুলিশের দল এসে তাদের বাড়ি থেকে টেনে হিচড়ে তুলে নিয়ে যায়, অভিযোগ—তাঁরা বাংলাদেশি! অথচ প্রত্যেকের কাছেই ভারতীয় পরিচয়পত্র ছিল বলে জানিয়েছেন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা।
কী ঘটেছিল সেদিন রাতে?
ভাড়াবাড়িতে থাকতেন এই শ্রমিকরা। প্রতিবেশীদের ভাষ্য, পুলিশ কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই আসে এবং সরাসরি বাংলায় কথা বলার ভিত্তিতে তাঁদের জাতীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। স্থানীয় থানায় যোগাযোগের পর জানা যায়, তাঁদের বিরুদ্ধে FIR নেই, শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে আটক করা হয়েছে।
এই ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রশাসনের তরফ থেকে তৎক্ষণাৎ গুজরাট সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং বাংলার শ্রমিকদের অবিলম্বে মুক্তি চাওয়া হয়েছে।
রাজনীতিক প্রতিক্রিয়া: ভাষার উপর আক্রমণ?
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটনাটিকে “ভাষা সন্ত্রাস” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে,
> “বাংলায় কথা বললে বাংলাদেশি? এ কোন ভারতবর্ষ তৈরি হচ্ছে? বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে এখন বাঙালি মানেই অপরাধী!”
তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যেই দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এখন গুজরাটে তা প্রকাশ্যে এল। এর প্রতিবাদে তিনি নতুন করে শুরু করেছেন “ভাষা আন্দোলন ২.০”।
তৃণমূলের তীব্র নিন্দা
তৃণমূল কংগ্রেস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে,
> “ভোটের আগে মোদী-শাহ বাংলার দরজায় দরজায় গিয়ে হাতজোড় করে ভোট চান। আর ভোট মিটতেই বাংলার শ্রমিকদের ঘরে ঢুকে তাঁদের বাঙালি পরিচয়ের জন্য হেনস্থা করে। এটা শুধু ঘৃণ্য নয়, ভয়ানকভাবে জাতিগত বিদ্বেষমূলক।”
তাঁদের দাবি—২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলার মানুষ এই ঘটনার যোগ্য জবাব দেবে।

এটা কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা?
গুজরাট পুলিশের এই আচরণকে অনেকেই “রাষ্ট্রীয় স্তরের বাঙালি বিদ্বেষের ফলাফল” বলে দেখছেন। শুধুমাত্র ভাষা, পোশাক বা চেহারা দেখে কাউকে বাংলাদেশি বলে সন্দেহ করা এবং আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই আটক করা দেশের সংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে খাপ খায় না।
বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির ‘এক ভাষা, এক জাতি’ নীতির পরিণতি হিসেবে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে টার্গেট করা হচ্ছে। এতে শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা যেমন প্রশ্নের মুখে পড়ছে, তেমনই ফেডারেল কাঠামোর উপরেও আঘাত হানছে।
বাংলা শুধু একটি ভাষা নয়, এটি একটি জাতিগত পরিচয়। যেখানে ভাষা অপরাধের সমতুল্য হয়, সেখানে মানবাধিকার প্রশ্নের মুখে পড়ে। গুজরাটে বাঙালি শ্রমিকদের উপর এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ভাষার রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক চেতনা মিশিয়ে দেওয়া এক বিপজ্জনক প্রবণতা।
বাংলা এই অপমান কখনও ভুলবে না, আর ২০২৬ সেই গণতান্ত্রিক প্রতিশোধের মঞ্চ হতে চলেছে—এমনটাই বার্তা দিচ্ছে বাংলার রাজনীতি ও জনমানস।